হাইকোর্টে খালেদার অর্থদণ্ড স্থগিত : পথ চেয়ে বসে বিএনপি নেতা-কর্মীরা

0
487

জামিনের শুনানি রোববার

আফজাল আহমেদ: কারাদÐের রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে নিম্ন আদালতের দেয়া অর্থদÐের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনের শুনানির জন্য রোববার দিন ঠিক করে দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এসব আদেশ দেন। হাইকোর্ট এ মামলার নিম্ন আদালতের নথিও তলব করেছেন। যা ১৫ দিনের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
গত ৮ই ফেব্রæয়ারি ঢাকার আলিয়া মাদরাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছর এবং অন্য আসামিদের ১০ বছর করে কারাদÐ দেন। তাদের অর্থদÐও দেয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার এ আপিলের গ্রহণযোগ্যতার শুনানির শুরুতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, আপিল শুনানি গ্রহণের জন্য আবেদন করছি। আপিল গ্রহণ করলে জামিনের আবেদন দেয়া হবে। আদালত বলেন, কী প্রেয়ার আছে? শুধুই আপিল অ্যাডমিশন চেয়েছেন? জবাবে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, এ ধরনের আবেদনে সাধারণত যা যা থাকে তাই আছে। আদালত নথি দেখে বলেন, কনভিকশন কি স্থগিত করা যায়? ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডম্যান্ড অ্যাক্টে কনভিকশন স্থগিতের বিধান নেই। আপনারা তো কনভিকশনও স্থগিত চেয়েছেন। জবাবে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, আবেদন গতানুগতিক হয়েছে। আমরা ঠিক করে দেব। আমরা প্রথা অনুযায়ী আবেদন করেছি।
একপর্যায়ে আদালত আপিল গ্রহণ করে আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, খালেদা জিয়াকে এই মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া অর্থদÐ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে এই মামলার বিচারিক আদালতের নথি আদেশের ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠাতে হবে।
শুনানিতে এজে মোহাম্মদ আলী খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন উপস্থাপন করেন। আদালতের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বেগম জিয়া গত ১৫ দিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বয়স্ক। তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করবেন আশা করি। তার সাজাও কম। তাই তার জামিন প্রাপ্য। তাকে জামিন দেয়া হোক।
এ সময় দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, এই মামলায় অনেক বড় গ্রাউন্ড রয়েছে। আদালত বলেন, এজন্যই তো আপনারা টকশো তে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। খুরশিদ আলম খান বলেন, ফৌজদারি আইনে কম সাজার ক্ষেত্রে জামিনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুদক আইনে এ সুযোগ নেই।
একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন। জরিমানা স্থগিত করেছেন। বিচারিক আদালতের নথিও তলব করেছেন। কিন্তু আমরা আজ সকালেই নথিপত্র পেয়েছি। নথি পর্যালোচনার পর আমরা শুনানি করবো।
রায়ে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে:রিজভী
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায়ে উদ্ধৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জবানবন্দি বিকৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আদালতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে জবানবন্দিতে দিয়েছেন সেটিকে বিচারক ড. আখতারুজ্জামান তার রায়ে বিকৃতি করে উদ্ধৃত করেছে। জবানবন্দিতে বেগম জিয়া এক জায়গায় বলেছিলেন, নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে, ছাত্র ও শিক্ষকদের হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? অপব্যবহার আমি করেছি? উনি প্রশ্ন করছেন বিক্ষুব্ধ হয়ে। এটাকে বিচারক (রায়ে) বলেছেন যে আসামি বেগম খালেদা জিয়া ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারার বিধান মতে আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানিতে স্বীকার করেছেন যে তিনি অপরাধ করেছেন। খালেদা জিয়ার বক্তব্য এভাবে বিকৃত করে বিচারক রায় দিয়েছেন। প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে দিয়ে উনি (বিচারক) দাড়ি দিয়ে দিয়েছেন।
বুধবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন।
রিজভী আরও বলেন, ন্যায়বিচারকে পদদলিত করে বিচারক ড. আখতারুজ্জামান যে কুৎসিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাতে তিনি ইতিহাসে কলঙ্কিত ব্যক্তি হয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনার জমানায় ইনসাফ যে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে তা এই ড. আখতারুজ্জামানদের মতো বিচারকদের কারণে।
বিএনপির বিক্ষোভে পুলিশের গুলি: গুলিবিদ্ধ ৩০
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে গেলেও কোথাও কোথাও পুলিশ মারমুখী। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান, অনশন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচির মাধ্যমেই দলীয় প্রধানের মুক্তি দাবি করছেন নেতাকর্মীরা। তবে প্রতিটি কর্মসূচিতেই পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বাধা প্রদান ও হামলা করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।
মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ছোড়া, লাঠিপেটা, নেতাকর্মী আটকের অভিযোগ করেছে দলটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছে হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জে জেলা বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের ছোড়া গুলিতে ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এসময় হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জিকে গউছ বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। ফরিদপুরে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামা ওবায়েদের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের করলে পুলিশ সেই মিছিলে লাঠিপেটা করে। এসময় শ্যামা ওবায়েদসহ বিএনপির অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হন। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানেও শান্তিপূর্ণ মিছিল পুলিশ বাধা দিয়েছে এবং নেতাকর্মীদের লাঠিপেটা করেছে।
নির্বাচন প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আয়োজনের লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ আহ্বান জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এ সময় ফখরুল বলেন, ‘ঐক্য প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যের আহ্বান অব্যাহত রাখবে বিএনপি। বর্তমানে আমরা সংকটময় সময় পার করছি। এ থেকে পরিত্রাণের দায়িত্ব শুধু খালেদা জিয়া বা বিএনপির নয়। তাই এখন আমরা সবাইকে আহ্বান জানাব, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে আসতে।’
খালেদা নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে সিইসি
এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে আইনগতভাবে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিলে তিনি অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সিইসি এসব কথা বলেন।
এসময় সিইসি বলেন, খালেদা জিয়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন আমার প্রত্যাশা। তবে সিদ্ধান্ত নেবে আদালত।
এর আগে ঢাকায় সফররত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে সিইসি জানিয়েছিলেন, খালেদার বিষয়ে উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। এ ব্যাপারে ইসি’র কিছু করার নেই। খালেদার নির্বাচনের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কেএম নূরুল হুদা বলেন, এখন যে অবস্থায় তিনি (খালেদা) আছেন এতে নির্বাচন করতে পারবেন না।
এখন উনি তো সাজাপ্রাপ্ত। এরপর সুপিরিয়র কোর্টে গেলে তারা যেভাবে নির্দেশ দেবেন সেভাবে হবে। এখনও আপিল করেননি। সে রকম পরিস্থিতি হলে কি হবে সেটা তো বললাম। আপিল যখন করেননি ওই অবস্থায় সাজা আছে।
সুতরাং ওই অবস্থায় তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না। তারপর উচ্চ আদালতে গেলে কি রকম ডিরেকশন আসে তার ওপর নির্ভর করি আমরা। বিএনপি’র চেয়ারপারসন নির্বাচন করতে পারবেন কি না, এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। ফলে আইনি ব্যাখ্যারও প্রয়োজন আছে।
কেএম নূরুল হুদার এক বক্তব্য তুলে ধরে জানতে চাওয়া হয়, আপনি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে সেটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। এখন উচ্চ আদালত থেকে আপিল নিষ্পত্তি হয়ে যদি এ রকম একটা পরিস্থিতি হয় যে, বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচনে আসতে পারছেন না, সেক্ষেত্রে কী বলবেন? উত্তরে সিইসি বলেন, এত দূরের কথা বলা যাবে না। এখনও তো অনেক সময় আছে। নির্বাচন তো অনেক দূরে। কী অবস্থা হবে, তা বলা মুশকিল। আমাদের কাছে উচ্চ আদালত আছে, সুপ্রিম কোর্ট আছে, তারপর আমরা আছি।
আমি আশা করি যে, এই সমস্যার সমাধান হবে। আমি এও আশা করি যে, সব সমস্যার সমাধান করে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here