জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করলো যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া

0
676

বিবিসি: ফিলিস্তিনি ভূখন্ড থেকে দখলকৃত জেরুজালেমকে ইসরইলের রাজধানী ঘোষণা করলো যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস থেকে ১০ মিনিটের এক বক্তব্যে একথা ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এসময় তার পাশে ছিলেন। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল আবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেবার ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ৭০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বহু প্রেসিডেন্ট তেলআবিব থেকে দূতাবাস সরিয়ে নেবার কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবায়ন করেননি। এখন সময় হয়েছে এটি সরিয়ে নেবার। কারণ, ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসা এখানে, বহু অ্যাম্বাসীর অবস্থান এখানে, রয়েছে অনেক সরকারী অফিসও। সেদিক বিবেচনায় অনেক আগেই যা করার প্রয়োজন ছিল, আমি আজ তা করলাম। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি দু’রাষ্ট্র পদ্ধতিকে সমর্থন করেন যদি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিরা তার মেনে নেয়।
তিনি বলেন, আমি আমার ভাইস প্রেসিডেন্টকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাব শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসরাইল ও আরব নেতাদের সাথে আলোচনা করে তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য। আমি জানি, মধ্যপ্রাচ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্বসহ বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে কঠিন দিন আসছে। তিনি ‘গড বেøস ইউ, গড বেøস ইসরায়েল, গড বেøস প্যালেস্টাইন এন্ড গড বেøস ইউনাইটেড স্টেটস’ বলে তার ১০ মিনিটের বক্তব্য শেষ করেন।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে স্বভাবতই ইসরাইল সন্তুষ্ট, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা ছাড়াও পুরো আরব বিশ্বের নেতারা সাবধান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকেই নস্যাৎ করবে। ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, এ স্বীকৃতির অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। এমনকী আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র সউদী আরব বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ‘পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য চরম এক উস্কানি’।
ইসরাইল বলে এসেছে ‘অভিন্ন জেরুজালেম তাদের চিরদিনের রাজধানী’। আসলে ১৯৪৮ সালে ইসরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ইসরাইল জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে। ১৯৬৭ সালে আরবদের সাথে যুদ্ধে জিতে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরাইলি রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে ঘোষণা করে।
ফিলিস্তিনিরা কী বলে?
ফিলিস্তিনিরা কোনোদিনই পূর্ব জেরুজালেমের দখল মেনে নেয়নি। তারা সবসময় বলে আসছে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।
ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। তাদের কথা, জেরুজালেম তাদের না থাকলে কোনো টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কখনই সম্ভব হবে না। যদিও গত দশকগুলোতে পূর্ব জেরুজালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তারপরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি যারা শত শত বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ও মেনে নিয়েছে, জেরুজালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি রফার অংশ হিসাবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে তা লিখিত আকারে রয়েছে।
ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। সমস্ত বিদেশি দূতাবাস তেল আবিবে, যদিও জেরুজালেমে অনেকে দেশের কনস্যুলেট রয়েছে। এতদিনের সেই নীতি এখন ভাঙছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ট্রাপ কেন এই ঝুঁকি তিনি নিলেন?
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘প্রেসিডেন্ট নেহাতই একটি বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন’। তাদের কথা, ইসরাইলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া তার উদ্দেশ্য নয়। তারা বলার চেষ্টা করছেন, জেরুজালেমের সীমানা নিয়ে ইসরাইলের অবস্থান এখনও আমেরিকা মেনে নিচ্ছে না, সেটা ঠিক হবে চূড়ান্ত শান্তি মীমাংসায়।
ফিলিস্তিনিরা কোনোভাবেই তাতে ভরসা পাচ্ছে না। তাদের কথা, মি. ট্রাম্প জেরুজালেমে ইসরাইলের তৈরি ডজন ডজন অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোতে স্বীকৃতি দিয়ে দিচ্ছেন।
ওয়াশিংটনে বিবিসির সংবাদদাতা বারবারা প্লেট-উশেরও বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইহুদিদের সমর্থন পেতে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন, জিতলে তিনি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেবেন এবং মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করবেন। তিনি সেই প্রতিশ্রæতি রাখছেন। সংবাদদাতা বলছেন, এই স্বীকৃতি দিয়ে মি. ট্রাম্প যে পরে প্রতিদান হিসাবে শান্তিচুক্তি ত্বরান্বিত করতে ইসরাইলের ওপর চাপ দেবেন, তার কোনো ইঙ্গিতই নেই।
বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া, ইন্তিফাদা ঘোষণা হামাসের
এদিকে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য সহ ক্ষোভে ফুঁসছে মুসলিম বিশ্ব। আন্তর্জাতিক মহলে হচ্ছে কড়া সমালোচনা। অনেক স্থানে পোড়ানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। বিক্ষোভ হয়েছে ইস্তাম্বুলে আমেরিকান কনস্যুলেটের বাইরের বিক্ষোভে। ইন্তিফাদা ঘোষণা করেছে ফিলিস্তিনের যোদ্ধা গোষ্ঠী হামাস।
ট্রাম্পের ঘোষনায় হতাশা প্রকাশ করছেন বিশ্বের রাজনৈতিক বোদ্ধারা। ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তুরস্ক, জর্ডান, সৌদি আরব, বৃটেন, জার্মানি, ফ্রান্স সহ বিভিন্ন দেশ। প্রতিবাদ জানাতে ইরাকে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইরাক। তুরস্ক বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্নিবলয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তকে সৌদি আরব ‘অহেতুক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এ বিষয়ে কড়া নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরবের রয়েল কোর্ট। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত গভীর হতাশাজনক। সৌদি রয়েল কোর্ট বলেছে, শান্তি প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা সে অবস্থা থেকে দৃশ্যত সরে এসেছে। জেরুজালেম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র যে ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখছিল তাও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুঁতেরা। তিনি বলেছেন, এটা হলো গভীর হতাশার একটি মুহূর্ত। তিনি আরো বলেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র মুখপাত্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো সহায়ক হবে না। ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিষয়ে শুক্রবারই জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। শুধু আরব ও মুসলিম দুনিয়াই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশও ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে। এরই মধ্যে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের বাইরে বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়েছে। ওদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক সমস্ত মুসলিমকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, যেকোনো স্থানের মুসলিমদের এটা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিতে হবে যে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এমন ঘোষণার কড়া নিন্দা জানাচ্ছি। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন। তারা উভয়েই বলেছেন, ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তে তাদের সমর্থন নেই। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রধান কূটনীতিক ফেডেরিকা মঘেরিনি।
ওআইসি’র জরুরি বৈঠক আহ্বান
আরব লীগের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে জর্ডান ও ফিলিস্তিন। বুধবারই তারা এমন আহ্বান জানায়। এতে বলা হয়, জেরুজালেমে অবস্থিত আল কুদস-এর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা আলোচনা হবে ওই বৈঠকে। কূটনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সৌদি গেজেট বলেছে, শনিবার ওই বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান ১৩ই ডিসেম্বর ইস্তাম্বুলে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here