গেম মেকার কি সিইসি হুদা-ই 

0
537

নতুন বিতর্কের জালে বাংলাদেশ কোন কৌশলে এগুবে আওয়ামী লীগ

 

নাসিরা আফরোজ রোজী: বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে ধারাবাহিক আলোচনায় শেষ করেছে। তাদের লক্ষ্য আগামী সাধারণ নির্বাচন। তবে এই আলোচনা শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার মন্তব্যে চমকে উঠেছে পর্যবেক্ষক মহল। অবশ্য এই বক্তব্য তিনি আগে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে এই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের একই বক্তব্য রাজনীতির মাঠে ঝড় তুলেছিল। সেদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তার বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জিয়াউর রহমানের গুণগান করার প্রসঙ্গ ইঙ্গিত করে ইসিকে হুশিয়ার করে বলেন, ইতিহাসের স্যাটেলড বিষয় নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করবেন না। বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যায়ের একজন নেতা সাংবাদিকদের বলেন, সিইসি বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যার অবকাশ থাকায় বিতর্ক এড়ানোর জন্য কমিশনকে সতর্কতার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন সিনিয়র এক নেতা।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ইতিহাস রাজনীতি চর্চা করবেন না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা।

অন্যদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কম কথা বলার পরামর্শ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, কথা বলার জন্য আমরা রাজনীতিবিদরা আছি। কম কথা বলে কিভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করুন। বক্তব্যের কারণে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আগ বাড়িয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

ওবায়দুল কাদের আরো বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের প্রশংসার বিষয়টি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কৌশল হতে পারে। তিনি বলেন, বিএনপি এখন খুশি খুশি। এই ভাবটা যেন নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকে। নিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি নেতাদের মধ্যে খুশির স্রোত বইছে। খুশি বেশিদিন থাকবে না। অবশ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের উদ্বোধনী বক্তব্যেও সিইসি কেএম নূরুল হুদা শেখ হাসিনার প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। তিনি তার ভাষায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানের কথা তুলে ধরেন সিইসি। ফলে পর্যবেক্ষরা মনে করিছিলেন, সেটি ছিল কথার কথা।

কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের সে হিসাব যে মিলছে নাসিইসির বৃহস্পতিবারের বক্তব্য সে দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কিন্তু বৃহস্পতিবার সিইসি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা উল্লেখ করে দেয়ে বলেন বক্তব্য ইতিহাস। তিনি নিজেও তা বিশ্বাস করেন। সিইসি বলেছেন, কাউকে খুশি করার জন্য তিনি বক্তব্য দেননি।

বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে সিইসির ওই বক্তব্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেনএমন বক্তব্য এখনো ওউন (ধারণ) করেন কিনা সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, হ্যাঁ। এখনো ওউন করি। আমি বিশ্বাস করি। এটা তথ্যভিত্তিক বলেছি। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, জিয়াউর রহমান সাহেব ১৯৭৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর নতুন দল গঠন করেছিলেন। তার আগে ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র ছিল না। তার আগে (১৯৭৫ সালের আগে) গণতন্ত্র ছিল। আমি বলেছিলাম, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন, প্রতিষ্ঠা নয়। তার আগে বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল। জিয়াউর রহমানের সময়ে গণতন্ত্র আবার ফিরে এসেছে। সেই ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ বহুদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। বহুদল সংসদে যোগ দিয়েছিল। বহু দল সংসদ পরিচালনা করেছিল। কাউকে খুশি করার জন্য এটা বলিনি, তথ্যভিত্তিক বলেছি।

বর্তমান আইনি কাঠামোতে সেনা মোতায়েন কোন প্রক্রিয়ায় হবেএমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সেনা নিয়োগ কিভাবে হবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে তা নির্ধারণ করবে ইসি। বিষয়ে সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। নির্বাচন আসুক তখন পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা যাবে। তবে বিদ্যমান কাঠামোতে সেনা মোতায়েন করা যাবে। সংলাপে সেনা মোতায়েন, সংসদ ভেঙে দেয়াসহ অনেক প্রস্তাব এসেছে। এমন অবস্থায় সংলাপের পর ইসি ভারমুক্ত হলেন নাকি চাপে আছেনএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ না করা পর্যন্ত আমরা ভারমুক্ত হই না। ভার তো আমাদের উপর থাকবে, চ্যালেঞ্জ থাকবে। সেগুলো সমাধান করতে হবে।

এদিকে সুপ্রীমকোর্টে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কিছু মন্তব্যের কারণে তার চরম পরিনীত সবার সামনে এখন উদাহরণ। সরকার সে বিষয়ে কোন রাখঢাক করেনি। তাকে তার সাংবিধানিক পদ থেকে সরিয়ে তো দিয়েই সেই সাথে তাকে দেশছাড়াও করেছে। তিনি বহুদিন ধরেই ছিলেন, সংবাদ শিরোনামে। তার গতিপথ এখন অনেকটাই নির্ধারিত। এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে শিরোনামে এলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। প্রথম দফায় জিয়াউর রহমানের প্রশংসার করে সিইসির বক্তব্য আওয়ামী সরাসরি তাদের সাথে ইসির সংলাপে চ্যালেঞ্জ করে। আনুষ্ঠিানিক চ্যালেঞ্জ ছাড়াও তাদের বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন বক্তব্যে সিুিসকে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে। ফলে বৃহস্পতিবার নতুন করে সিইসির বক্তব্য যেন আওয়ামী লীগকেই তিনি এখন সরাসরি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করলেন।

সিইসির এই বক্তব্য আওয়ামী লীগ মেনে নিলে তাদের রাজনীতি থাকে না। প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রতিদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে যে অনবরত অভিযোগ করে আসছেনতা অসত্য প্রমানিত হয়। আওয়ামী লীগের জন্য সিিিসর এই বক্তব্য এমনকি সুপ্রীমকোর্টে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কিছু মন্তব্যের চেয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জ। ফলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন দেশের আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সাথে শেখ হাসিনার সরকারের পরম দ্বন্দ্ব আসন্ন।

প্রধান বিচারপতির অস্বাভাবিক ছুটিকে কেন্দ্র করে যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছিল গোটা দেশে হাসিনা সরকারের আপাতইবজয়ের মাধ্যমে তার অবসান ঘটলেও আলোচনাসমালোচনা, তর্কবিতর্ক, নানা রকমের গুজবও একের পর এক চলছে। রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ, সামরিক শাসন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেসামরিক শাসক গোষ্ঠী সবই দেখেছে। বিচার বিভাগে ক্যু  সম্পর্কে পর্যবেক্ষরা বলছেন ক্যুএর মেরিট বা ডিমেরিট মূল্যায়ন করবে ইতিহাস। কিন্তু যা ঘটছে দেশে তাতে অগণতান্ত্রিক শক্তি নিশ্চিত উৎসাহিত হবে।

গত ১৩ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি বিদেশ গমনের মধ্য দিয়ে মনে করা হচ্ছিল, পরিস্থিতির অবসান হবে। তা আর অবসান হচ্ছে না। এখনকার সময়টাকে সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা বিরতি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

উচ্চ আদালতে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে যখন তীব্র আলোচনা এবং বিতর্ক চলছে, তখন স্বাভাবকিভাবেই প্রশ্ন উঠে আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন যেন কিছুটা নড়েচড়ে উঠছে।

সাপ্তাহিক প্রবাস গত সপ্তাহে লিখেছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক হাওয়া ক্রমশ: অচেনা পথে হাটতে শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই হাওয়া যেন কোন পর্যবেক্ষকেরই ভবিষ্যতবাণী মানছে না। হালে সব কিছুই যেন টালমাটাল। বছরের ক্ষমতাসীন সরকারের আচরণ, এই সরকারের প্রশাসনের আচরণ, বিরোধীদলের ভুমিকা, নির্বাচন কমিশনের কথাবার্তা এমন কি প্রতিবেশী ভারতসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নড়াচড়া সবই যেন কেমন গড়মিল।

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশে সফরে বিভিন্ন ইস্যুতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান জানিয়ে গেলেন। সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশে সফর শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার পর নিয়ে কেউ মুখ খুলছে না কিন্তু আলোচনার ঘাটতি নেই। সফরের পরপরই দেশবিদেশী পত্র পত্রিকায় সেনাবাহিনীর নিয়ে কথা হচ্ছে। সিইসির চ্যলেঞ্জিং বক্তব্য এসেছে। দেশের আইন ভেঙে ক্সবাজারে সেনাবাহিনীর একটি টিম বেসামরিক অভিযানে নামে সাত পুলিশকে অপহরণ চাাঁদাবাজীর অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। এটি যেন, অনেকটা ৭৪ সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকান্ডের কতঅ মনে করিয়ে দেয় একই সাথে প্রেসিডেন্ট সাত্তারের আমলে তৎকারীর যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাগি থেকে সন্ত্রাসী ইমদুর গ্রেফতারের বিষয়টিও সামনে চলে আসে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে সংলাপের সূচনা করেছিল, তা শেষ হয়েছে। এই সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমের কর্মী নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন অনেক প্রস্তাব পরামর্শ পেয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ সব দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে এসব প্রস্তাব পরামর্শ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এখন নির্বাচন কমিশনের কাজ।

তবে দলগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাব পরামর্শে নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন করা বা না করার বিষয়টি খুবই গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রসঙ্গটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী প্রস্তাব এসেছে দলগুলোর তরফে। আবার নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা না দেওয়ার মতো একটি প্রস্তাবও এসেছে একটি দলের পক্ষ থেকে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ এসেছে ইসির কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করার ব্যাপারে।

এখন নির্বাচন কমিশনকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে কী কী বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।নির্বাচন এর অর্থই হচ্ছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে দরকারি সবকিছুই ইসিকে করতে হবে। এর মধ্যে কিছু নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে আবার কিছু প্রতিষ্ঠানটির আওতার বাইরে। কিন্তু আওতার বাইরে থাকলেই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়।

কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, আদৌ নির্বাচন পর্যন্ত সবকিছু গড়াই কীনা সে প্রশ্নটিও সামনে চলে আসছে। ইসির ক্ষমতা রয়েছে, তারা যদি মনে করে যথাযথ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অবশ্যপালনীয় কোনো বিষয় আছে, সে ব্যাপারে তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, অনুরোধ জানাতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে দরকারি সব ধরনের সহায়তা দিতে সরকার দায়বদ্ধ। সরকার যদি কোনো ক্ষেত্রে তা না করে, তবে তাদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সিইসি সরকার যদি এখনই বড় ধরণের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তবে সেখানে কী সুপ্রীম কোর্টের মতো ইসিতেও আরেকটি ক্যু সামাল দেওয়া কি আওয়ামী লীগ সরকোরের পক্ষ্যে আদৌ সম্ভব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here