মডেল থেকে জঙ্গি

0
521

শাহজালাল আহমেদ: ২০০৯-১০ সালের কথা। তখন তিনি মডেল হিসেবে কাজ করতেন। র্যাম্প মডেল হিসেবে বেশ খ্যাতিও পেয়েছিলেন। ইনফরমেশন টেকনোলজি’র (আইটি) ব্যবসা করতে গিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন এ সেক্টরেও। গৃহসজ্জার ব্যবসাও করেন সফলতার সঙ্গেই। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ২৯ বছরের এই যুবকের নাম মেহেদি হাসান। সবকিছু ছেড়ে ২০১৫-১৬ সালের দিকে তিনি ঝুঁকে পড়েন জঙ্গিবাদে। সেই থেকেই নিষিদ্ধ পথে পথচলা তার। নিজের নামের আগে জুড়ে দেন ‘ইমাম’ শব্দটি। নিজ গ-িতে পরিচিত হয়ে ওঠেন সাংগঠনিক নাম আবু জিব্রিল নামে। এই ইমাম মেহেদি হাসানের হাতেই তৈরি হয়েছে বহু জঙ্গি। অনেকের বাইয়াত দিয়েছেন তিনি। সেই নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। যাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে বিভিন্ন জঙ্গি অভিযানে মারা গেছে, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে। আবার কেউ এখনো গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি দুর্র্ধষ এই জঙ্গি নেতা ইমাম মেহেদি হাসান ওরফে আবু জিব্রিলের। ধরা পড়েছেন র্যাবের জালে। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানার দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৩ এর একটি দল।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান, র্যাব-৩ এর কমান্ডিং অফিসার।
তিনি বলেন, ইমাম মেহেদি হাসানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল হলি আর্টিজানের ঘটনায় নিহত জঙ্গি নিবরাসের। তিনি জেএমবি’র সারোয়ার-তামিম গ্রুপের একটি ব্রিগেডের কমান্ডার।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর সিও জানান, হলি আর্টিজানসহ দেশের বিভিন্নস্থানে হামলা চালাতে জেএমবি (সারোয়ার-তামিম গ্রুপ) দু’টি অপারেশনাল ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা করে। ‘বদর স্কোয়াড ব্রিগেড’ হলি আর্টিজানসহ অন্যান্য হামলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অপর একটি ব্রিগেড ‘ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনী’ ব্যাকআপ বা রিজার্ভ ব্রিগেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। ‘ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনী’ তথ্যপ্রযুক্তিতে অত্যন্ত আধুনিক। গোপনে তারা কর্মী বা সদস্য সংগ্রহে নিয়োজিত ছিল। তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মূল অপারেশনাল কাজে অংশগ্রহণকারী ‘বদর স্কোয়াড’-এর বেশিরভাগ সদস্য নিহত ও আটক হওয়ায় ব্রিগেডটি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ব্যাকআপ ব্রিগেড হিসেবে রক্ষিত ‘আদ্-দার-ই-কুতনী’ সদস্য সংগ্রহ করে শক্তিশালী হওয়ার কার্যক্রম শুরু করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমাম মেহেদী হাসান জানিয়েছে, সে ২০১৫ সাল থেকে জেএমবি’র সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হলি আর্টিজানে নিহত নিবরাসসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। তিনি কর্মী সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধকরণ ও হিজরতের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পর্বসমূহ সম্পন্ন করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে তিনি ‘ব্রিগেড আদ্ দার-ই-কুতনী’র কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্প্রতি কর্মীদের আনুগত্য পরীক্ষার পর কিছু অংশকে উগ্রবাদী কর্মকা-ে উদ্বুদ্ধ করে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। এজন্য তিনি ঢাকা, টাঙ্গাইল ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলা করতে উদ্বুদ্ধ সদস্যদের শপথ (বাইয়্যাত) দেন। এসব শপথের (বাইয়্যাত) ভিডিও চিত্র ধারণ করে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে উগ্রবাদী চ্যানেলে প্রচার করে অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।
গ্রেপ্তারকৃত আবু জিব্রিলের বরাত দিয়ে র্যাব-৩ এর সিও আরো বলেন, ব্রিগেড আদ্-দার-ই-কুতনী’তে আনসার (সাহায্যকারী), মুহাজির (যোদ্ধা), সালাফি আলেম বোর্ড এবং অর্থ প্রদানকারী বিভিন্ন ব্যক্তি রয়েছে। এই ব্রিগেডকে শক্তিশালী করতে সদস্যরা নিয়মিত তাকে ইয়ানত (অর্থ) প্রদান করতেন। সেই অর্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশে জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যয় করতেন। আবু জিব্রিল জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ সদস্যদের মধ্যে সাংগঠনিক বিয়ের ব্যবস্থাও দেখভাল করতেন। তার মাধ্যমে হিজরত করা ২ জঙ্গি ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। র্যাব জানায়, তার কাছ থেকে উদ্ধার করা আলামত থেকে জানা যায়, এই ব্রিগেড ‘আদ্-দার-ই-কুতনী’ অপারেশনাল সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং যেকোনো স্থানে নাশকতা ঘটানোর জন্য সক্ষম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here