ভারতে সাম্প্রদায়িকতার এক দীর্ঘ যুদ্ধ

0
463

অধ্যাপক জয়তী ঘোষ

গত কয়েক দশকে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ যেভাবে সাম্প্রদায়িকরণের শিকার হয়েছে, তাতে করে উদ্বিগ্ন এবং একইসাথে ক্ষুব্ধ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে বদ্ধমূল সংস্কার আর গুজবে ভর করে স্বাভাবিক জীবনধারাটা বারবার অস্বাভাবিক দিকে বাঁক নিয়েছে। স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় ধরনের বৈষম্যই রয়েছে। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে দুর্বলদের ‘অন্য’ বা ভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস। এতে করে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত কঠোর হচ্ছে। উদার ও ভিন্নমতালম্বীদের কণ্ঠস্বরের জন্য জায়গা ও অবস্থা অব্যাহতভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রয়েছে, জীবনধারা এবং সব ধর্মীয় গ্রুপের লোকজনের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে সরে যেতে বাধ্য করার পরিকল্পিত প্রয়াস।
তবে সবচেযে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহিংসতার সদা-উপস্থিত হুমকি। যেকোনো সময় তা দাঙ্গা, ধর্মীয় উত্তেজনা আকারে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তির ওপরও হামলা হতে পরে। আর তা ঘটতে পারে ‘উস্কানিতে’ কিংবা বিনা উস্কানিতেই। এর বিধ্বংসী শক্তি ভয়াবহ। কেবল জীবনহানিই নয়, সেইসাথে জীবিতদের মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষতিও হয় মারাত্মক পর্যায়ের। তাছাড়া জীবিকায় দেখা দেয় অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও ঘটে। সমৃদ্ধ একটি পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো- ভয় আর সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি। পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব পন্থায় ‘স্বাভাবিক’ কার্যক্রম চালানো হয়ে পড়ে অসম্ভব।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নৃশংসতা এখন সুপরিচিত ও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের সহিংসতা সৃষ্টিকারী সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে সবচেয়ে কম। অথচ ভবিষ্যতের দাঙ্গা এবং আরো সহিংসতার শঙ্কা বজায় রাখতে এর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আর এই বিষয়টির দিকেই আলোকপাত করেছেন আইনজীবি ওয়ারিশা ফারাসাত এবং আইনকর্মী প্রীতা ঝা। তাদের পর্যালোচনা তারা তুলে ধরেছেন তাদের ঝঢ়ষরহঃবৎবফ ঔঁংঃরপব: খরারহম ঃযব ঐড়ৎৎড়ৎ ড়ভ গধংং ঈড়সসঁহধষ ঠরড়ষবহপব রহ ইযধমধষঢ়ঁৎ ধহফ এঁলধৎধঃ (ঞযৎবব ঊংংধুং ঈড়ষষবপঃরাব, ঘবি উবষযর, ২০১৬) বইতে। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তদন্ত করেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে লড়াই করেছেন। দায়মুক্তির সংস্কৃতি কিভাবে ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে তারা তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন।
লেখকেরা আবেগবর্জিতভাবে কাজটি করেছেন। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বিহারে এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা নিয়ে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। উভয় দাঙ্গাতেই টার্গেট ছিলেন মুসলিমরা। দাঙ্গা চলেছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। এতে বিপুলসংখ্যক বয়স্ক ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া ধর্ষণ এবং অঙ্গহানির মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটতে থাকে। অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হলে আক্রান্তরা অন্তত বিচার পাওয়ার স্বস্তি অনুভব করতো। কিন্তু দেখা গেছে, বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভয়াবহভাবে বিঘœ সৃষ্টি করা হয়েছে।
আবার তা কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্রবণতা কিংবা একটি রাজ্য সরকারে সীমাবদ্ধ নয়। গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিষয়টি সবার জানা। কিন্তু বিহারের ভাগলপুরে তো বিজেপি ছিল না। সেখানে লালু প্রাসাদ, তার স্ত্রী রাবরি দেবী এবং পরে নীতিশ কুমার সরকারে ছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।
লেখকরা দেখতে পেয়েছেন, পুলিশের ভূমিকা স্পষ্টভাবেই দলীয় আনুগত্যভিত্তিক। আক্রান্তরা সহায়তাদের জন্য ব্যাকুল আবেদন জানাতে থাকলেও পুলিশ নির্মমভাবে উদাসীন থাকে। এমনকি জিডি করা এবং সেটা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার কাজটিতেও তারা অযথা বিলম্ব করে থাকে। তদন্ত যথাযথভাবে হয় না। শক্তিমানদের এড়িয়েই তদন্ত শেষ করার প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যায়। সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে জীবিতদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে পুলিশই কেবল জটিলতা সৃষ্টি করে তা নয়। আদালতও বিষয়গুলো যথাযথভাবে যতœশীল থাকে না। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা আদালত থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা বলতে গেলে পায়ই না। আইনের সামগ্রিক-প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের তদাররিক যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। আবার বিচার-প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে যে, মনে হবে, কোনো দিনই এটা শেষ হবার নয়। আক্রান্তরা একপর্যায়ে জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। ভাগলপুরের দাঙ্গা হয়েছে ২৮ বছর আগে, আর গুজরাটেরটা ১৫ বছর আগে; অথচ এখন পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি।
দাঙ্গায় অনেকে তাদের পরিবার সদস্যদের হারিয়েছেন, অনেকে সম্পত্তি, জীবিকা খুইয়েছেন। কিন্তু একদিকে ন্যায়বিচার তারা পাননি, ক্ষতিপূরণের মুখও তারা এত দিনে দেখতে পাননি। ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াটাও বেশ জটিল। এখানেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এই বইটিতে ভারতের বিচারব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, দাঙ্গা দমনে কার্যকর পন্থা নিতে হলে এ দিকটির দিকেই বেশি নজর দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সদস্যসহ যে কারো জন্যই এটা বড় ভুল হতে পারে, যদি তারা ধরে নেয়, তারা এতে আক্রান্ত যেহেতু হবে না, তা-ই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই তাদের। নাগরিকদের একটি ছোট অংশের বেলায়ও যদি নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তবে তা স্পষ্টভাবেই তার অকার্যকারিতার প্রমাণ। আর সেটা একসময় অনিবার্যভাবে আমাদের সবাইকেই আক্রান্ত করবে। ওয়ারিশা ফারাসাত ও প্রীতা ঝা এই বিষয়টিই নজরে এনেছেন। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হলো- তাদের পরিশ্রম বৃথা না যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান। সেটা শুরু করতে হবে বিচার বিভাগকে সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে।
(ফ্রন্টলাইন থেকে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here