যুক্তরাষ্ট্র,কানাডায় ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে

0
1055

কুইবেকে মসজিদে গুলিতে নিহত , টেক্সাসে মসজিদ পুড়ে ছাই

 

 

প্রবাস রিপোর্ট: কানাডার কুইবেকে এক ইসলামবিদ্বেষী বন্দুকধারী মসজিদে ঢুকে নামাজের জামাতে গুলি চালাল জন নামাজী নিহত হয়েছে। অন্যদিকে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুসলিম দেশের নাজরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারীর একদিনের মধ্যেই এসব ঝটনা ঘটেছে। সেই সাথে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হেইট ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা।

শনিবার কুইবেক মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে জন নিহত আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন দাবি করা হয়। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সংকীর্ণ উগ্র জাতীয়তাবাদী মেনিফেস্টো গ্রহণ করেছিলেন। এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এখন পুরো পশ্চিমা সমাজকেই অনেক বেশি অস্থিতিশীল ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র বর্ণবাদি চিন্তার প্রথম প্রধান টার্গেট হয়ে উঠেছে মুসলমানরা।

কানাডায় মসজিদে বর্বর হামলা, নিহত

কানাডার মসজিদে অস্ত্রধারীরা গুলি করে হত্যা করেছে কমপক্ষে জনকে। এতে আহত হয়েছেন অনেকে। একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করছে কানাডার পুলিশ। ঘটনা ঘটেছে কানাডার সেইন্টেফয় এলাকার কুইবেক সিটি ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে। রোববার সেখানে প্রায় ৫০ জন মুসল্লি মাগরিবের নামাজ আদায় করার সময় তিন অস্ত্রধারী প্রবেশ করে গুলি চালানো শুরু করে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঘটনাস্থল থেকে এক সন্দেহভাজন একটু দূরেই আরেক সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। পুলিশ ধারণা করছে, আর কোনো ব্যক্তি এতে জড়িত নয়। খবর দিয়েছে বিবিসি মিরর।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রার্থনা আশ্রয়ের স্থানে মুসলিমদের ওপর চালানো এই সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানাই আমরা।

ঘটনার পর ওই এলাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মসজিদের মেঝে ভেসে যায় মুসল্লিদের রক্তে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় বেশ কিছু এম্বুলেন্স সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ নিশ্চিত করে বলেছে যে, সন্দেহজনকভাবে দুব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আটক করা দুজনের মধ্যে একজনের কাছে পাওয়া গেছে একে৪৭ রাইফেল। তাদের একজনের বয়স ২৭ বছর। রেডিও কানাডা বলেছে, আটক দুব্যক্তিরই কুইবেক ঘরানার নাম রয়েছে।

কানাডার কুইবে মসজিদে হামলার জন্যে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারকৃত ২৭ বছরের যুবক আলেক্সান্ডার বিসনেট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের কট্টোর জাতীয়তাবাদী নেত্রী ম্যারিন লি পেনের সমর্থক। মসজিদটিতে গুলি করে জনকে হত্যার দায়ে আলেকজান্ডার বিসনেটের বিরুদ্ধে হত্যা হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে মামলার পর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। তার ছবিও প্রকাশ করেছে মিডিয়া। সে নিয়মিত অভিবাসীদের তিরস্কার করত।

পুলিশের কাছে আলেকজান্ডার বিসনেট ডানপন্থী কট্টোর রাজনীতির সমর্থক ট্রাম্প এবং লি পেনের সমর্থক বলে দাবি করে। একটি নারীবাদি অনলাইনে সে নিয়মিত উগ্র রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার করত, এবং ফ্রান্সের উগ্রাবাদি জাতীয়তাবাদী নেত্রী ম্যারিন লি পেনের দ্বারা সে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। আলেকজান্ডার পড়াশুনা করত ফ্রেঞ্চকানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। রোববার রাতে সে বন্দুক নিয়ে কানাডার কুইবেকে সেইন্টিফয় এলাকায় ইসলামিক কালচারাল সেন্টার মসজিদে হামলা চালায়।

তার বিরুদ্ধে আদালতফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার বা হত্যা ফাইভ কাউন্টস অব এ্যাটেমটেড মার্ডার বা হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনেছে। তার সঙ্গে হামলাকারী অপর তিনজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। কুইবেকের মসজিদে যখন মুসল্লিরা নামাজ পড়ছিল তখন বন্দুকধারীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

টেক্সাসে মসজিদে আগুন

 

এদিকে শুক্রবার সাতটি মুসলিম দেশের শরণার্থীদের প্রবেশ নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর নিষেধজ্ঞিা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশ জারির কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দক্ষিণপূর্ব টেক্সাসেরভিক্টোরিয়া ইসলামিক সেন্টার নামের মসজিদটি পুড়িয়ে দেয় র্দবৃত্তরা।

তবে মসজিদে আগুনের ঘটনায় ভিক্টোরিয়া শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার তৈরি হয়েছে। মসজিদটির কর্মকর্তাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষ এবং ইহুদি খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ের প্রতিনিধিরা। ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মুসলমানরাও মসজিদটির সামনে ছুটে আসেন। এর মধ্যে ভিক্টোরিয়া থেকে চার ঘণ্টা দূরত্বের হিউস্টন ডালাসে বসবাসকারী মুসলমানরাও ছিলেন।

আগুন দেয়ার ঘটনায় জনসাধারণের কাছ থেকে ব্যাপক সহানুভূতি পাওয়ার পর মসজিদটি পুনর্র্নিমাণের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। এজন্য তহবিলের আবেদন জানালে অনলাইনেগোফান্ডমি নামক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়।

টেক্সাসের ভিক্টোরিয়া এলাকার ইসলামিক সেন্টার থেকে প্রায় ১০০ মুসলমানকে সহায়তা দেওয়া হতো। আগুন দেওয়ার সময় মসজিদের ইমাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অসহায়ের মতো চোখের সামনে মসজিদ পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি তিনি।

 মসজিদটির প্রেসিডেন্ট শাহিদ হাশমি বলেন, এটি একটি উপাসনালয়। তদন্তের জন্য এখন সেখানে যাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তাই বাধ্য হয়ে মসজিদের বাইরের অংশে প্রার্থনা করছি।

পূণর্নির্মাণে ব্যাপক সাড়া

টেক্সাসে একটি মসজিদ পুড়িয়ে দেয়ার পরপরই তা আবারও নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন মুসলমানরা। মসজিদটি নির্মাণের জন্য সাড়ে আট লাখ ডলার তহবিল চেয়ে আবেদন জানানোর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ জোগাড় হয়েছে। অনলাইনে গণচাঁদার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি, খ্রিস্টান নাস্তিকদেরও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।

বাইবেল প্রধান নামে পরিচিত উগ্র খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকাটিতে ২০০০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এর এক বছর পরেই টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার ঘটেছিল।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাত লাখ ডলার গণচাঁদা পাওয়া যায়। গোফান্ডমির পেজে গিয়ে দেখা গেছে, চাঁদাদাতাদের মধ্যে মুসলমানদের পাশপাশি অনেক ইহুদি, খ্রিস্টান এবং নাস্তিক ব্যক্তিও রয়েছেন। ইউরোপ থেকে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আগত ইহুদিদের বংশধর বেঞ্জামিন টাম্বার রোজেনাউ মসজিদটি নির্মাণে ১০০ ডলার দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা ইহুদিরা যেমন ইউরোপে আক্রান্ত হয়েছিলাম তেমনি আমেরিকাতে আরেকটি সম্প্রদায়কে (মুসলমান) ভিত্তিহীন ঘৃণার শিকার হতে দেখছি। কাজে আমাদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ সরকারের বড় অংশ সহযোগিতা করছে।

মার্টিন ওয়াগনার নামে আরেকজন চাঁদাদাতা বলেছেন, ‘আমি একজন খ্রিস্টান। আপনাদের (মুসলমানদের) সঙ্গে যা হয়েছে তাতে আমি কষ্ট পেয়েছি এবং হতাশ হয়েছি। ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নির্যাতন থেকে মুক্তির স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভিক্টোরিয়া ইসলামিক সেন্টারের প্রেসিডেন্ট শহীদ হাশমি বলেন, শনিবার সকালে মসজিদটি পুড়তে দেখে আমরা শোকাহত হয়ে পড়ি। তবে জনগণের কাছ থেকে সহানুভূতি এবং সহযোগিতা পেয়ে অভিভূত হাশমি। তিনি বলেন, যেভাবে হৃদয়গ্রাহী সাড়া পাচ্ছি তা অবিশ্বাস্য। আমরা খুবই কৃতজ্ঞ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here