খালেদার মামলা : কারাগারে বিশেষ আদালত নিয়ে বিতর্ক

0
70

 

বাস রিপোর্ট: গত মঙ্গলবার কারাগারে বিশেষ আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার শুরু হয়েছে।   নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বকশীবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন মাঠে নির্মিত এলাকাটি জনাকীর্ণ থাকে। সে জন্য নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশেষ জজ আদালত নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এর প্রশাসনিক ভবনের নম্বর কক্ষকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হলো।

বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন বিশেষ মামলা নং ১৮/২০১৭ এর বিচার কার্যক্রম পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নং এর অস্থায়ী আদালতে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়।

এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার এই বিচার কার্য শুরু হওয়ায় নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিএনপি নেতারা বলছেন, কারাগারে আদালত বসিয়ে সরকার বিচারের নামে নাটক করছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে তার আইনজীবিরা বয়কট করেছে।

কারাগারের আদালত

বুধবার দুপুরে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের ভেতরে বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস বসিয়ে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আদালতের বিচারক ঢাকার নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। বেলা ১১টার দিকে তিনি আদালতে আসেন। খালেদা জিয়াকে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে আনা হয়। পরনে ছিল বেগুনি রঙের শাড়ি। চেয়ারে বসা অবস্থায় তার পায়ের ওপরের অংশ থেকে নিচ পর্যন্ত সাদা চাঁদর দিয়ে ঢাকা ছিল। আধা ঘণ্টারও কম সময় আদালতের কার্যক্রম চলার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা না থাকায় শুনানি মুলতবি করে আগামী ১২ ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ ঠিক করে দেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান।

সরেজমিন দেখা গেছে, পুরনো কারাগারটির দুদিকের সড়কেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যান চলাচল। বন্ধ রাখা হয়েছে আশপাশের দোকানপাটও। ছাড়া যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সামনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও। সড়ক দিয়ে যাওয়া প্রত্যেক পথচারীরই শরীর তল্লালি করা হচ্ছে। ছাড়া কোনো রিকশাও প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না কারাগারের পাশের রাস্তায়।

জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার শুনানি এত দিন চলছিল কারাগারের কয়েকশ গজ দূরে বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন কারা অধিদফতরের মাঠে বিশেষ এজলাসে।

নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের নম্বর কক্ষকে আদালত ঘোষণা করে সেখানেই দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার শুনানি করার নির্দেশ দেয়। কারাগারেই আরেকটি ভবনের দোতলার একটি কক্ষে গত সাত মাস ধরে বন্দি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এতিমখানা দুর্নীতির মামলায় গত ফেব্রæয়ারি একই বিচারক তাকে পাঁচ বছর কারাদÐ দেন।

যত দিন ইচ্ছা সাজা দিন, আমি আর আসতে পারব না: খালেদা

এদিকে কারাগারেরর আদালতে উপস্থিত হয়ে সেখানে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজের অসন্তোষ ব্যক্ত করেন। আদালতে বিচারককে খালেদা জিয়া বলেন, আপনার যত দিন ইচ্ছা সাজা দিন, আমি অবস্থায় আসতে পারব না। আদালতে আমার ন্যায়বিচারও হবে না। খালেদা জিয়া বলেন, আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে আসতে পারব না। আর এভাবে বসে থাকলে আমার পা ফুলে যাবে।

তিনি বলেন, আমার সিনিয়র কোনো আইনজীবী আসেনি। এটি জানলে আমি আসতাম না। আদালতকে খালেদা জিয়া বলেন, আমাকে জেলে রাখতেই আয়োজন করা হয়েছে।

আদালত থেকে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমার কোনো সিনিয়র আইনজীবী আদালতে ছিল না। তাদের যথাযথভাবে নোটিশ দেয়া হয়নি। যে প্রজ্ঞাপন গত রাতে করা হয়েছে, তা সাত দিন আগে কেন করা হয়নি। আদালতকে জানিয়েছিআমি অসুস্থ, বারবার আসতে পারব না।

প্রধানমন্ত্রীর কথা: আইনজীবীরর খালেদাকে বয়কট করেছেন

দুই কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কারাগারে স্থাপিত আদালতে যাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যেহেতু আদালতে তার আইনজীবীরা যাচ্ছেন না তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি তার আইনজীবীরা মনে করছেন খালেদা জিয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তাদের হাতে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই। অথবাহয়তো আইনজীবীরা খালেদা জিয়াকে বয়কট করেছেন। এক্ষেত্রে কোনটা হয়েছে সেটা বিচার্য বিষয়। প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের  সভার সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ডাকা জরুরি বৈঠকে আলোচনা করেন।

সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ বছর মামলা চলার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। একটা মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। কোর্টের রায় হয়েছে বলেই তিনি কারাগারে। আরেকটি মামলারও কাজ চলছে। যে কোনো মামলার সময় বাঁধা তাকে। কিন্তু যে কোনো ছুঁতায় হোক খালেদা জিয়া কোর্টে যান না। খালেদা জিয়া তো কোর্টে যানই না আবার তার আইনজীবীরাও সময় নেন। এখানে আমার একটি প্রশ্নতিনি যদি নির্দোষ হবেন তাহলে মামলা মোকাবিলা করতে ভয় কিসের। আর তার আইনজীবীরা কেন কোর্টে যাবেন না? ইতিমধ্যে তারা বলল খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার অভাব। উনার শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে। উনি বেশি নড়তেচড়তে পারছেন না। তাই তার শারীরিক অবস্থা নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কোর্ট জেলগেটে বসানো হলো। সরকারি প্রজ্ঞাপনে কোর্ট যেকোনো জায়গায় বসতে পারে। কোর্টের ইচ্ছায় সে ব্যবস্থা করা যায়।

কারাগারে নাটকসিনেমা স্টাইলে আদালত কক্ষ

নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে আদালত বসিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা বে আইনি সংবিধানবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। কারাগারে নাটকসিনেমায় যেরকম দেখানো হয় সেই আকৃতির একটি আদালত কক্ষ কারাগারে তৈরি করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সংবিধানের ৩৫ () এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারা মোতাবেক আদালত বলতে একটি উন্মুক্ত আদালতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের যে নম্বর কক্ষটিকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে তা সংবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী উন্মুক্ত আদালত নয় বা হতে পারে না।

তারা বলেন, সেখানে পাবলিক তো দূরের কথা খালেদা জিয়া অন্য আসামিদের নিয়োজিত আইনজীবীগণ, আসামিদের আত্মীয়স্বজন খালেদা জিয়ার দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবেশ আদালতের কার্যক্রম দেখা বা শ্রবণ করারও কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘নাটকসিনেমায় যে রকম দেখানো হয় সেই আকৃতির একটি আদালত কক্ষ বসানো হয়েছে যেটি একটি গুহার মতো  স্যাঁতসেঁতে এবং সেখানে স্বাভাবিক শ্বাসনিঃশ্বাসের ব্যবস্থা নেই।

জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ। তিনি কারা অভ্যন্তরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিনি কারা অভ্যন্তরে যেকোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন মর্মে আশংকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান নিষ্ঠুর সরকার খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার পরিবর্তে তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শারীরিক মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আদালতে উপস্থিত থেকে আদালতের কার্যক্রম শ্রবণ, নিয়োজিত আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় তথ্যউপাত্ত সরবরাহ করা একজন বিচারপ্রার্থীর মৌলিক অধিকার। কিন্তু খালেদা জিয়া এতই অসুস্থ যে, তার পক্ষে আদালত কক্ষে বসে মামলার কার্যক্রম শ্রবণ, বুঝা বা আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ ইত্যাদি কিছুই তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সংবিধান মেনেই কারাগারে আদালত স্থাপন: অ্যাটর্নি জেনারেল

এদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংবিধান মেনেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করায় সংবিধান লঙ্ঘন হয়েছেবিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার বিকালে এক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, কারগারে আদালত স্থানান্তর করায় সংবিধান লঙ্ঘন হয়নি। নিরাপত্তাজনিত কারণেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে।

আইন আদালত না মানাই বিএনপির চরিত্র: কাদের

এদিকে বিচারকের উদ্দেশে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি আইন মানে না, আদালত মানে না। আমরা লক্ষ করেছি সংবিধান তারা কখনোই মানে না। এটাই বিএনপির বৈশিষ্ট্য, এটাই তাদের চরিত্র। তারা যদি আদালত না মানে আদালতে সেটার জবাব দেবে, সিদ্ধান্ত নেবে। বুধবার বিকালে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমÐির নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ সহযোগী সংগঠনগুলোর সভাপতি সাধারণ সম্পাদকদের এক যৌথ সভার শুরুতে তিনি এসব কথা বলেন।

কাদের বলেন, বয়স বিবেচনায় তার (খালেদা জিয়া) পক্ষে কোর্টে মুভ করা সব সময় হয়তো সম্ভব না। জিয়া চ্যারিটেবল যে মামলা, সেই মামলাও তো তিনি হাজিরা দিচ্ছিলেন না। এমতাবস্থায় তাকে হাজিরা দেয়া সুবিধা করে দেয়ার জন্য এই বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here