ভিআইপিদের হাসার অধিকার

0
124

ড. এম এ মোমেন
‘রাইট টু টক ননসেন্স’ যখন লিখি, একবারো মনে হয়নি ভিআইপিদের হাসার অধিকারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বেশিই।
একুশ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাস যখন লেখা হবে, আগামী দিনের গবেষক তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবেন, ‘বাজে কথা’র যত না প্রতিক্রিয়া, তার শতগুণ দেঁতো হাসির।
অধিকার আদায় ও অধিকার হরণ-দুটোতেই রাজনীতিবিদরা কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তান ও ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে অধিকার হরণের যতসব অর্ডিন্যান্স আইন এবং সংশোধনী, এসবের র্যাটিফিকেশন হাসতে হাসতে রাজনীতিবিদরাই করেছেন।
ভিআইপি রাজনীতিবিদদের নিজেদের হাসির অধিকার ক্ষুণœ হোক, এটা কখনো কাম্য হতে পারে না। তারা তো আর রামগরুড়ের ছানা নন যে, তাদের হাসির ওপর সুকুমার রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন:
রামগুরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা
হাসির কথা শুনলে বলে
হাসব না-না, না-না।
সবাই মরে ত্রাসে ঐ বুঝি কেউ হাসে
এক চোখে তাই মিটমিটিয়ে
তাকায় আশেপাশে।
… … …
রামগরুড়ের বাসা ধমক দিয়ে ঠাসা
হাসির হাওয়া বন্ধ সেথায়
নিষেধ সেথায় হাসা।
মাছের মধ্যে ভিআইপি-গোছের মাছ হচ্ছে বোয়াল। বহু বছর আগে এ দেশেরই দূরদর্শী ছড়াকার রোকনুজ্জামান খান লিখেছিলেন :
‘বোয়াল মাছের হাসি দেখে/পিলে চমকে যায়।’
বাংলাদেশ এমন পিলে চমকানো হাসি দেখে থ হয়ে গিয়েছে। সমস্যা তো হাসি নিয়ে নয়, ‘কমটেক্সট’ এবং ‘টাইমিং’ নিয়ে।
ক’দিন আগে রুশদেশের কৃষিমন্ত্রী আলেক্সান্ডার কাচভ মুসলমান অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়ায় হালাল পর্ক রফতানির একটি প্রস্তাব দিলে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন প্রচÐ অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন। দুই দশকের কাছাকাছি সময় প্রেসিডেন্ট পদে আসীন পুতিনকে কেউ এমন করে হাসতে দেখেননি।
হালে পুতিন ও ট্রাম্পকে নিয়ে কিছু পোস্টিং অনেকেই পেয়েছেন।
এমন দুটি স্থান-কাল-পাত্রের তোয়াক্কা না করে আমাকেও হাসিয়েছে। একটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভøদিমির পুতিনকে বলছেন, ‘হ্যা রে পুতু, হ্যাক করে ইলেকশন জেতা যায়, ফুটবলে জেতা যায় না।’
পুতিনের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে যে আদর-সোহাগ করে পুতু ডাকা যায়, এ সুযোগ কে না নেবে!
দ্বিতীয়টিতে পেয়েছি পুতিন শব্দের একটি অসাধারণ প্রয়োগ। তিনটি পাশাপাশি ছবির একটি সেট। শিরোনাম ‘রহস্যের সমাধান’!
প্রথম ছবিটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা, পরেরটি দেখতে প্রায় মোনালিসার কাছাকাছি চেহারার এক নারী, তার তিন নম্বর ছবিটিতে সেই নারীর চেহারার কাছাকাছি চেহারার একজন পুরুষ -পুতিন। ছবির সেটটির নিচে ক্যাপশন ‘মোনালিসার নাতিনের ঘরের পুতিন’।
এ বছরই মে মাসে আলজেরিয়ার বিচারমন্ত্রী তাইয়েব লাও সংসদে প্রশ্নোত্তর সেশনে একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় হাসতে থাকেন; তিনি হেসেই চলেন, যে বাক্যটি বলতে চেষ্টা করছেন, তা বলতে পারছেন না। এটি এমন কোনো হাসির কথাও নয়। মন্ত্রীর হাসি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে, কিন্তু হাসির কারণ কেউ উদ্ঘাটন করতে পারেননি।
হাসিই সর্বোত্তম ওষুধ!
লাফটার ইজ দ্য বেস্ট মেডিসিন- এটা বিশ্বাস করতে করতেই বড় হয়েছি। কিন্তু এ ওষুধটির অপপ্রয়োগ ও পরিণতি দেখার পর হাসি নিয়ে নতুন করে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়েছি।
রবিন ফার্নার ও জেফ্রি অ্যারনসন হাসি-সংক্রান্ত ৭৮৫টি গবেষণাপত্র রিভিউ করে বিখ্যাত ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে যে নিবন্ধ লিখেছেন, তাতে হাসিকে যতটা না ওষুধ মনে হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মনে হয়েছে অসুখ। হাসি থেকে মন্দ যা কিছু ঘটতে পারে তার একটি তালিকা: অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হৃৎকম্পনের ছন্দ নষ্ট হওয়া, হৃদযন্ত্রে জখম ও রক্তপাত, হাঁপানির আক্রমণ, ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা, ফুসফুসে এম্ফিসিমা নামক রোগ, মাংসপেশির দৃঢ়াবস্থা নষ্ট, মাথাব্যথা, স্ট্রোক, হার্নিয়ার প্রকোপ, চোয়ালের স্থানচ্যুতি, মুখের ভেতর অনাকাক্সিক্ষত দ্রব্যের প্রবেশ, হাসি থেকে রোগ সংক্রমণ, ইনকনটিনেন্স বা মূত্র ধরে রাখতে অক্ষমতা।
হাসতে হাসতে এমনকি বড়দেরও প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার যেসব কাহিনী শোনা যায়, তা মোটেও মিথ্যে নয়।
এখানেই শেষ নয়, যথোপযুক্ত কারণবিহীন হাসি (আনপ্রভোকভ লাফটার) থেকে ব্রেইন টিউমার, মস্তিষ্কে রক্তজমা, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হতে পারে।
জেমস হেম্বলিনের লেখায়ও অ্যাবডমিনাল হার্নিয়া নেমে আসা, মূত্র ধরে রাখতে না পারা, মাথাব্যথা, চোয়াল স্থানচ্যুতি এবং হূৎস্পন্দনে স্বাভাবিক ছন্দে বিচ্যুতির ওপর জোর দেয়া হয়েছে; অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং স্ট্রোককেও উড়িয়ে দেয়া হয়নি।
হাসির যেসব কল্যাণকর দিকের কথা বলা হয়ে থাকে, তার সবই যে পরীক্ষিত সত্য এমন নয়। তারপরও হাসির লাভ-ক্ষতির ব্যালান্স শিট দেখলে বেশি লাভের কথাই ‘হয়তো’ বলা হবে।
একই রকম হাসির ঘটনায় মানুষ যখন একা থাকে, কম হাসে; যখন মানুষের সান্নিধ্যে থাকে বেশি হাসে।
উৎসাহ দিয়েছেন মার্ক টোয়াইন হাসির আঘাতের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই টিকতে পারে না।
মন্ত্রীর হাসি এবং এর পরিণতি যদি মার্ক টোয়েন দেখতেন, তাহলে উদ্ধৃতিটি নতুন করে লিখতেন।
হাসিমৃত্যু -এটা ক্ষুদিরামের ‘হাসি হাসি পরব ফাঁসি/দেখবে ভারতবাসী’ নয়। এটা প্রতীকী কোনো ব্যাপারও নয়। হাসতে হাসতে মৃত্যু। গ্রিক দার্শনিক, পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ ক্রিস্পাস (জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ২৭৯ অব্দ-মৃত্যু খ্রিস্টপূর্ব ২০৬ অব্দ) মর্নিংওয়াক সেরে ঘরে ঢুকে যখন দেখলেন তার জন্য রাখা নাশতা তার গাধাটি খেয়ে ফেলছে, তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, হাসি থামল না, হাসতে হাসতে তিনি মারা গেলেন।
আরাগনের রাজা মার্টিন (জন্ম ২৯ জুলাই ১৩৫৬Íমৃত্যু ৩১ মে ১৪১০) তার দরবারের একজন ভাঁড়ের বলা একটি কৌতুক শুনে হাসতে হাসতে পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন (অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, রাজা আগে থেকে অজীর্ণ রোগ ও প্লেগে ভুগছিলেন)।
পিয়েত্রো আরেতিনো (১৪৯২-১৫৫৬) ইতালীয় কবি, নাট্য, মডেল, ঠগ এবং আধুনিক পর্নোগ্রাফির জনক হাসতে হাসতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।
১৬৬০ সালে স্কটিশ বুদ্ধিজীবী ও অনুবাদক টমাস ওরকুহার্ট শুনলেন বহু সংখ্যক সন্তানের জনক দ্বিতীয় চার্লস ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেছেন, তিনি ভয়ঙ্কর এক অট্টহাসি দিয়ে পরক্ষণেই মারা গেলেন।
১৯৮৪ সালে লন্ডনে হার ম্যাজিস্টি’স থিয়েটার হলে হাসির একটি অভিনয় করতে গিয়ে কমেডিয়ান টমি কুপার হাসি থামাতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি মঞ্চের মেঝেতে পড়ে যান এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
হাসাতে হাসাতে মৃত্যু এবং হাসতে হাসতে মৃত্যুÍ দুটোই পাল্লা দিয়ে ঘটে। যারা স্বভাবতই হাসেন এবং যারা স্থান-কাল-পাত্র আমলে না নিয়ে হাসেন, তারা নিশ্চয়ই সতর্ক হবেন, এমনকি যারা ভিআইপি, তারাও।
খ্রিস্টজন্মের পাঁচ শতক আগে গ্রিক চিত্রশিল্পী জিওক্সিসকে সুন্দরী দেবী আফ্রোদিতির ছবি এঁকে দেয়ার জন্য এক ধনাঢ্য বৃদ্ধা দায়িত্ব দিলেন, টাকা পয়সাও দিলেন। তিনি খুব জোরাজুরি করেন যেন আফ্রোদিতির মডেল হিসেবে শিল্পী তাকেই ব্যবহার করেন। তাকে মডেল বানিয়ে ছবি আঁকার পর ছবির দিকে তাকিয়ে শিল্পী হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়েন। আর উঠতে পারেননি। শিল্পী হাসিমৃত্যুর শিকার হন।
হাসি নিবারণের টিপস
বিশেষজ্ঞদের মাথাব্যথার শেষ নেই-সঙ্গতিপূর্ণ নয় -এমন পরিস্থিতিতে ভিআইপিদের হাসি নিবারণের জন্য কিছু টিপস দিয়েছেন :
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিপস- যে কারণে আপনি হাসছেন, সেখান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করুন। কিন্তু কেমন করে?
ক. সজোরে নিজেকে চিমটি কাটুন।
খ. ১০০, ৯৯, ৯৮… এভাবে দ্রæত গুনতে থাকুন।
গ. আপনি ক’জন নারীকে (নারী ভিআইপির বেলায় পুরুষকে) চেনেন, তাদের নাম মনে করতে থাকুন।
ঘ. ঘরের ভেতর কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে (ক্যামেরার দিকে নয়) তাকিয়ে থাকুন।
ঙ. ছোটবেলায় শেখা ছড়াগুলো মনে করতে চেষ্টা করুন।
(এগুলো স্বল্পমেয়াদের সমাধান এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর) দীর্ঘমেয়াদে যেসব টিপস দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:
১. হাসির কারণটা কী বের করুন। নার্ভাসনেস ঢাকার জন্য হাসতে পারেন; কথা বলার সময় উপযুক্ত শব্দ খুঁজে না পাওয়ার কারণে হাসতে পারেন; আপনি যে কথাটি বলেছেন, তা মিথ্যে এবং মিথ্যে বলে আপনি যে অন্যদের বোকা বানাতে পেরেছেন, সেই সাফল্য উদযাপন করতে হাসতে পারেন; যেসব কারণে হাসি পায় সেগুলো হচ্ছে ট্রিগার : কোনো মানুষের চেহারা, কোনো বিশেষ সময়, কোনো কাজ, কোনো বিশেষ স্থান, কোনো বিশেষ শব্দ আপনাকে হাসায়- এগুলো শনাক্ত করুন। শনাক্ত করতে পারলে সমস্যার অর্ধেকটা মিটে যাবে।
২. হাসির বিকল্প আচরণ বা রিপ্লেসমেন্ট বিহেভিয়ার বের করুন এবং সেই আচরণ দিয়ে হাসি প্রতিস্থাপন করুন।
৩. দ্রæত বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে হাসতে হাসতে হাসির স্টক কমিয়ে ফেলুন।
৪. কাশি দিয়ে হাসি ঢাকার চেষ্টা করুন।
৫. তার পরও যদি হাসি এসে যায়, দুদিন দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং বলুন- সুকুমার রায়ের হাঁসজারুর চেহারা হঠাৎ তখন মনে পড়ায় হেসে উঠেছিলাম।
লেখক: প্রাবন্ধিক; সাবেক সরকারি ও বেসরকারি বিমান কর্মকর্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here