‘ট্রান্সফোটেক’ যার স্বপ্ন : আইটি জগতে এক বিশেষ নাম ‘শেখ গালিব রহমান’

0
2472

প্রবাস রিপোর্ট: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আইটি (ইনফরমেশন টেকনোলজি) নিয়ে শেখ গালিব রহমান এক বিশেষ নাম। তিনি তার দক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং আইটি শিক্ষার আলো যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এমন পূর্বসুরিদের কর্মের ধারায় গালিব রহমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানত বাংলাদেশ কমিউনিটির নতুন প্রজন্মকে গড়ার মতো এক অনুকরণিয় মহৎ দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন ‘ট্রান্সফোটেক’-এর মতো আধুনিক এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জ্যামাইকায় ১৭৩ স্ট্রিট-এ অবস্থিত ‘ট্রান্সফোটেক’-এর মাধ্যমে ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইটি) আধুনিক শিক্ষায় গড়ে তুলছেন বাংলাদেশিসহ নানা দেশের অসংখ্য তরুণকে। এখানে তরুণদের বহু কাঙ্খিত স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলছেন নতুন প্রজন্মের এই কারিগর। শিক্ষার্থীরা আইটি জগতে তাদের একজন পথ প্রদর্শক হিসেবে দেখছেন গালিব রহমানকে। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে এই প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিও নিশ্চিত করা হচ্ছে সরকারী এবং কর্পোরেট হাউজে। এভাবে অসংখ্য পরিবারের কাছে গালিব রহমান একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে পরিচিতি। এখন গতিময় এক উজ্জ্বল জীবনের নাম। এই প্রতিষ্ঠানটি শত শত তরুণকে উপহার দিচ্ছে সুন্দর এক জীবনের সন্ধান।

শেখ গালিব রহমান মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০০৭ সালে ইমিগ্রেন্ট হয়ে ইউএসএ আসার পর ‘ডানকিন ডনেট’-এ কাজের ব্যবস্থা করে দেন দুসম্পর্কের এক চাচা। মাত্র ৮ ডলার দিয়ে যাত্রা শুরু। তবে গালিব প্রতিদিন স্বপ্ন দেখতে থাকলেন কবে কলেজে ভর্তি হবেন। পড়ালেখাই মনে গেঁথে ছিল সব সময়। বন্ধুরা গালিবকে গাড়ী চালাতে উৎসাহিত করতো। কারণ তাতে নগদ টাকা আছে। অন্যদিকে তাঁর মা’ ও বাবা দেশ থেকে প্রতিনিয়ত বলতেন, বাবা তুমি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হও। টাকা আমাদের দরকার নাই। এই অবস্থায় তিনি কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে পড়ালেখা করেছেন লাগোডিয়া কমিউনিটি কলেজ, নিউইয়র্ক সিটি কলেজ এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে । এরপর মাত্র ১১ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন একজন মেধাবী আইটি টেকনোলজিষ্ট হিসেবে। ইউএস গভর্মেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করার পাশাপাশি তিনি আইটি সেক্টরে চাকরির সুযোগও করে দিয়েছেন অসংখ্য তরুণকে।
শেখ গালিব রহমান হোমল্যান্ড সিকিউরিটির আইটির ম্যানেজার হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্টের এক্সিকিউটিভ অফিসের আইটির পরিচালক (ডিরেক্টর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমেরিকার শীর্ষস্থানিয় ব্যাংকে আইটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। আমেরিকা, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মিডিয়া তাকে নিয়ে প্রচার করেছে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার রাজনীতিবিদদের কাছে ‘মি: শেখ’ হিসেবে খুবই পরিচিত নাম।

নিজের সফলতা সম্পর্কে গালিব মনে করেন, আপনাকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করতেই হবে। তাহলে আর কিছুতেই পিছিয়ে পড়ার কোন আশংকা থাকে না।
২০১১ সালে সাফল্যের সঙ্গে কম্পিউটার সাইন্স পাস করেন গালিব। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে হান্টিংটন ন্যাশনাল ব্যাংক এ কম্পিউটার এনালিস্ট হিসেবে যোগ দেন কলম্বো ওহাইয়ু সিটিতে। নতুন জায়গা। শুরু হলো আরেক জীবন। নতুন কর্মস্থলে অল্প সময়ের মধ্যে তার পরিচয় হয় এক দল আন্তর্জাতিক স্টুডেন্টের সঙ্গে। তারা এমবিএ করছিল।
হান্টিংটন ন্যাশনাল ব্যাংক এ কম্পিউটার এনালিস্ট হিসেবে তিন মাস কাজ করার পর আইবিএম-এ ফুল টাইম চাকরি হলো। ইতোমধ্যে সিআইএস সিসিএনএ মতো ডাটা বেইজ কোর্সগুলো সম্পন্ন হয়। রেগুলার ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে লিড এর দায়িত্ব দেন কর্তৃপক্ষ। এ সময় ৪টা সম্মাননা অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয় তাকে। এই সময়টা ছিল গালিবের জন্য আরেক সোনালী সোপান। রিচমন্ড ভার্জিনিয়াতে ক্যাপিটাল ওয়াল্ড ব্যাংক-এ চাকরি হলো। চাকরির সুবাদে সম্পর্ক গড়ে উঠে নতুন এক সার্কেলের সঙ্গে। ওহাইয়ুতে থাকার সময়ই ভেকেশনে এসে জ্যামাইকাতে ট্রান্সফোটেক গড়ে তোলার কাজ শুরু। স্বপ্নের নতুন গাঁথুনি। ট্রান্সফোটেক যা তরুণদের উপরে উঠার এক মহামূল্যবান সোপান। জ্যামাইকায় এ নিয়ে কাজ করার শুরুতেই বাধা আসতে থাকলো। কিছু মানুষ চাইতো, নতুন প্রজন্মের জন্য ভাল কিছু না হোক। গালিব দৃঢ়তার সঙ্গে সে বাধা অতিক্রম করতে থাকলেন। একদিনের ‘আমি’ থেকে ‘ট্রান্সফোটেক’ এখন ‘আমরা’। একটা বিশাল পরিবার। এর সদস্য অনেক। মনের গহিনে তার একটা বিশ্বাস ছিল, প্রত্যয় ছিল। ছিল আন্তরিকতা।
ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে একদিন অসংখ্য তরুণ নুতন এক দিগন্তের সন্ধান খোঁজে পাবে এ বিশ্বাস তার মধ্যে ছিল সব সময়। তা এখন বাস্তবে সবাই উপলব্ধি করছে। যদি কয়েকজন তরুণের কথা বলা যায়, যারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্বশিল পদে কাজ করছেন। তাদের উদ্দেশ্যে গালিব একদিন বলেছিলেন, তোমরা কাজ শিখ মন দিয়ে। নিজের ঠিকানা নিজেই গড়ে নিতে পারবে।
নতুন প্রজন্মকে উপরে তুলে ধরাই ছিল তার সার্বক্ষণিক চিন্তা। তারা শিক্ষিত। তাদের একটু পথ দেখিয়ে দিলেই সন্ধান পাবে সাফল্যের। শুধু প্রশিক্ষণটা মন দিয়ে করলেই ভাল চাকরি পাওয়া যাচ্ছে। আইটি সেক্টরে হাজার হাজার জব খালি পড়ে আছে। মেধাবী ছেলে মেয়েদের হতাশ হবার কোন কারণ নাই। সোনালি দিন তো হাতের নাগালেই। ভাল প্রশিক্ষণ ট্রান্সফোটেক দিয়ে আসছে বলেই না সবাই এগিয়ে আসছে। ক্যাপিটাল ওয়ান ব্যাংকে চাকরি করার সময় গালিবের পরিচয় হয় সহকর্মী ডাইরেক্টর প্রদীপ মাচার্লার সঙ্গে। দুজন মিলে ফ্রি ট্রেনিং দেয়ার জন্য টিউটরিয়াল ওয়েব সাইট (সফটওয়ার কোয়ালিটির) ওপর কাজ শুরু করেন। এখন প্রতিদিন ২০ হাজার মানুষ এই সাইটে ঢুকছে। ট্রেনিং যাারা শেষ করেছেন তাদের কাছে ওই সাইট একটি শক্তিশালি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
ক্যাপিটাল ওয়ানের ডাইরেক্টর প্রদীপ মাচার্লার এবং গালিবের চিন্তা হলো ট্রান্সফোটেক পরিবারটি একদিন অনেক বড় হবে। এখন প্রত্যাশা আগামী দিনে অসংখ্য তরুণ তরুণির জন্য সাফল্যের ভান্ডার বয়ে আনবে ট্রান্সফোটেক। প্রদীপ মাচার্লার এখন ভারতের একটি কোম্পানির হেড অব দ্যা কান্ট্রি হিসেবে কর্মরত। গালিব নিজেই সরাসরি ক্লাস নেন। সাফল্যর কথা হচ্ছে অসংখ্য তরুণকে ভাল জায়গায় কাজের সুযোগ করে দেয়া। ট্রান্সফোটেক নতুন প্রজন্মকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করছে। গালিব ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)-এ ম্যানেজার হিসেবে একটা টিমের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সুবাদে ইউএসসিআইএস-এ এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়া অনেকের চাকরি হয়েছে। ভাল বেতন পাচ্ছেন তারা। সামনে তাদের পদোন্নতির সুযোগও আছে।
নতুন প্রজন্মের সাফল্যে গালিব নিজে অনুপ্রাণিত হন। উৎসাহিত বোধ করেন। তাদের জন্য আরো বেশি বেশি কাজের সুযোগ করে দেয়ার মধ্যেই তার আনন্দ। সে কারণে নবীন প্রবিণ সবার সঙ্গেই একটা গভীর যোগাযোগ রয়েছে গালিবের। তিনি নিজেও সেই সম্পর্ক রাখতে ভালবাসেন।
শিক্ষকতার মতো এক মহান পেশায় জড়িয়ে আছে গালিব রহমানের পুরো পরিবার। তার নানা, মা, ফুফু, খালাসহ অনেকেই মানুষের জন্য অকাতরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছেন যুগযুগ ধরে। সমাজে মানুষ গড়ার মতো এক মহৎ পেশাকে তাঁরা বেছে নিয়েছেন।
গালিব রহমানের বাবা এস এম সিদ্দিকুর রহমান দেশের একজন খ্যাতিমান ব্যাংকার। তার মা মাহিনূর ইয়াসমিন একজন শিক্ষিকা। নানা মালেক তালুকদার এলাকায় শুধু শিক্ষার আলো ছড়িয়েই থেমে থাকেননি। তিনি একজন দানবির হিসেবে পরিচিত। তার এই খ্যাতি নিজ জেলা ঝালকাঠির বাইরে গোটা বরিশালে ছড়িয়ে আছে। গালিবের দাদা অ্যাডভোকেট আশরাফ আলী বরিশাল অঞ্চলের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। যার যশ, খ্যাতি, প্রাচুর্যের কোন কমতি ছিল না। গালিব ছোট বেলায় স্বপ্ন দেখতেন দাদার মতো বড় মাপের একজন আইনজীবী হবেন। সে লক্ষ্যে এক বছর ঢাকায় আইন বিষয়ে পড়াশোনাও করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here