স্বপ্নের বিশ্বকাপ শুরু

0
220

ইমরান মাহমুদ: ক্যালেন্ডারের পাতায় বছর ঘুরে মাস, মাস শেষে সপ্তাহ আর সেখান থেকে দিন পেরিয়ে বিশ্বকাপের মহেন্দ্রক্ষণ শুরু হয়েছে। রাশিয়ায় পর্দা উঠছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া উৎসবের। প্রথমবারের মত ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’র দায়িত্ব পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার জাতীয় স্টেডিয়াম মস্কোর চোখ ধাঁধাঁনো লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের মন মতানো উদ্বোধোনী অনুষ্ঠানে নাচ আর গানে স্বাগতিক দেশ রাশিয়া তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সময় সকাল ১১টায় শুরু হয় আসরের প্রথম ম্যাচ। স্বাগতিক দল রাশিয়া আর সউদী আরবের উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে ফুটবল বিশ্বকে সুরের মুর্চ্ছনায় মোহাবিষ্ট করে রাখে রাশিয়া।

বিগত আসর গুলোর চাইতে কিছুটা ভিন্ন মাত্রার হতে যাচ্ছে এই উদ্বোধোন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় উইল স্মিথ, নিকি জ্যাম এবং কসোভার আলবেনিয়ান শিল্পী ইরা ইসত্রেফির গলায় এবারের টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল থিম সং ‘লিভ ইট আপ’ দিয়ে। সঙ্গে ছিল নাচ আর আতশবাজি।
মস্কোর ৮০ হাজার দর্শকের জন্য লুঝনিকির পুরো দুই ঘন্টার আয়োজনটি সাজানো হয় সুর-আর সংগীতকেন্দ্রীক। নব্বইয়ের দশকের ইংলিশ পপ তারকা রবি উইলিয়ামসের গান দিয়েই শুরু হয় ১২০ মিনিটের উদ্বোধোনী অুনষ্ঠান। তার সঙ্গে থাকবেন রাশিয়ার অপেরা সুপরানো অ্যাডি গ্যারিফুলিনা। ছিলেন বর্ষীয়ান স্প্যানিশ অপেরা শিল্পী প্ল্যাসিদো দোমিংগো ও খন দিয়েগো ফ্লোরেজের পরিবেশনা। সুরের মূর্চ্ছনায় একে একে মঞ্চ আলোকিত করেন পিয়ানো বাদক ডেনিস ম্যাটসুয়েভ, আন্তর্জাতিক অপেরা তারকা অ্যানা নেত্রিবকো, ইউসিফ ইভাজব, ইদার আবদ্রাজাকভ ও আলবিনা শাগিমুরাতোভা। তাদের এই আয়োজন আরো রঙিন করে তুলতে মঞ্চ মাতালেন প্রায় ৫০০ নাচিয়ে এবং জিমন্যাস্টের পার্ফরম্যান্স। লুঝনিকি স্টেডিয়ামের পাশাপাশি একই সময় মস্কোর রেড স্কয়ারেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে কনসার্ট আয়োজন করা হয়।
২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আসর জেনিফার লোপেজ আর পিট বুলের গান দিয়ে শুরু হয়েছিল। শেষবার ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী আসর মাতিয়েছিলেন সংগীতশিল্পী পিটবুল ও শাকিরা। ‘ইউ আর ওয়ান’ গানটি একসঙ্গে গেয়েছিলেন তারা। তখন বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে ব্রাজিলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে সা¤প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপের থিম সংয়ের কথা বললে এখনো মানুষের মনে ২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সেই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের সুরই ভেসে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের থিম সংটি গেয়েছিলেন শাকিরা।
এরইমধ্যে ফিফার সুনাম কুড়িয়েছে ভøাদিমির পুতিনের দেশ। এবার চলছে বিশ্বের লাখো-কোটি ফুটবলের পাগল দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখার চেষ্টা। আর এই মাঠেই ২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
রেকর্ড ভাঙা-গড়ার রাশিয়া বিশ্বকাপ
গত বিশ্বকাপে যেমন রোনাল্ডোর সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন মিরো¯øাভ ক্লোসা, তেমনি এবারের বিশ্বকাপেও কিছু কিছু রেকর্ডকে তাড়া করে বেড়াবেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও থমাস মুলারের মতো তারকারা। আবার স্বদেশী মেসির কাছেই রেকর্ড হারানোর শঙ্কায় থাকবেন ডিয়াগো ম্যারাডোনাও। রাশিয়া বিশ্বকাপে ভেঙে যেতে পারে, এমন দশ রেকর্ডের উপর চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক
০ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার। অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ৬ গোল করেছেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের নায়ক। পূর্বসূরিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন লিওনেল মেসি। গত বিশ্বকাপে ৪ গোল করেছিলেন, এবার অন্তত ৩ গোল করলেই ভেঙে যাবে ম্যারাডোনার রেকর্ড।
০ উরুগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামলেই একটি রেকর্ডের মালিক হয়ে যাবেন মিশরের গোলরক্ষক এশাম এল-হাদারি। ৪৫ বছর ৫ মাস বয়সী এই ফুটবলার মাঠে নামলেই হয়ে যাবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড়। এর আগে ৪৩ বছর ০৩ দিন বয়সে বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড ছিল কলম্বিয়ার ফরিদ মনদ্রাগনের।
০ রাশিয়া বিশ্বকাপে গোলের দেখা পেলেই অভিজাত এক ক্লাবের সদস্য হয়ে যাবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। অন্তত একটি গোল করলেই চার বিশ্বকাপে গোল করা খেলোয়াড়দের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ঢুকে যাবে রোনালদোর নাম। এর আগে কেবল উয়ি সিলার, পেলে ও মিরো¯øাভ ক্লোজাই তিনের বেশি বিশ্বকাপে গোল করেছেন। তবে শুধু রোনালদো নন, একই রেকর্ড হাতছানি দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার টিম কাহিল ও মেক্সিকোর রাফায়েল মার্কেজকেও।


০ অনন্য এক রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে জার্মানির থমাস মুলার। ২০১০ ও ২০১৪ দুই আসরেই ৫ টি করে গোল করেছেন তিনি। এবারের আসরেও ৫ গোল করতে পারলে টানা তিন আসরে ৫ গোল করা একমাত্র ফুটবলার হয়ে যাবেন তিনি।
০ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা ব্রাজিলের দখলে। ১৯৫৪ তে কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরির কাছে ৪-২ গোলে হারের পর বিশ্বকাপে কোন ম্যাচে ব্রাজিল হেরেছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে, এই হাঙ্গেরির কাছেই। মাঝে ১৩ টি ম্যাচে তাদের হারাতে পারেনি কেউ। ব্রাজিলের এই রেকর্ড এবার ভেঙে দিতে পারে জার্মানি। ২০১০ আসরের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর থেকে ৮ ম্যাচে পরাজয়ের স্বাদ পায়নি জার্মানরা। এবার কোন ম্যাচ না হেরে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারলেই ব্রাজিলের রেকর্ড ভেঙে দেবে জার্মানি।
০ ৫ টি বিশ্বকাপ খেলা মাত্র ৩য় ফুটবলার হতে যাচ্ছেন মেক্সিকোর রাফায়েল মার্কেজ। এর আগে কেবল স্বদেশী অ্যান্টোনিও কার্ভাহাল ও জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথিউসের ৫ টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড আছে। ইতালির বুফন পাঁচটি বিশ্বকাপের দলে থাকলেও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে কোন ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি।
০ বিশ্বকাপে টানা ৩ ম্যাচ ড্র করার রেকর্ডটি বেলজিয়ামের। গত বিশ্বকাপে শেষ ৩ ম্যাচ ড্র করা কোস্টারিকার সামনে সুযোগ থাকছে বেলজিয়ামের রেকর্ড ভেঙে দেয়ার।
০খেলোয়াড় এবং কোচ- দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড আছে কেবল ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের। ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারলে সেই তালিকায় নাম লেখাবেন দিদিয়ের দেশম।
০শেষ ষোলোতে উরুগুয়ে ও পর্তুগাল মুখোমুখি হয়ে গেলে অন্যরকম এক রেকর্ডের সাক্ষী হবে ফুটবল বিশ্ব। উরুগুয়ে কোচ অস্কার তাবারেজ ও পর্তুগাল কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের মিলিত বয়স হবে ১৩৫ বছর ৩ মাস, বিশ্বকাপের কোন ম্যাচে দুই দলের কোচের সম্মিলিত বয়সের দিক থেকে যেটি হবে সর্বোচ্চ।
০ কনক্যাকাফ অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড মেক্সিকোর দখলে। এবারের আসরে সার্বিয়া ও ব্রাজিলের বিপক্ষে হার এড়াতে পারলেই এককভাবে এই রেকর্ডের মালিক হয়ে যাবে গত বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচ না খেলে একটিতেও না হারা কোস্টারিকা।
২০২৬ আসওে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়
রাশিয়ায় শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। কাতারে বসবে ২০২২ সালে। আর বুধবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসর নির্ধারিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা।
দুই দেশের আয়োজনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ দেখা গেছে ২০০২ সালে। সেবার জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া মিলে বিশ্বকাপের আয়োজন করে চমকে দিয়েছিল সবাইকে। এরপরই ফিফা বলেছিল, এমন যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ আর নয়। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিশ্বফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এবার ছাড়পত্র মিলল তিন দেশের বিশ্বকাপ আয়োজনের। ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই প্রথমবারের মতো তিন আয়োজক দেশ দেখবে বিশ্বকাপ।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব লড়াই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে। একদিকে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে শুধুই মরক্কো। মস্কোয় ফিফার ৬৮তম কংগ্রেস অধিবেশনে মরক্কোকে ৬৯ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছে এই তিন দেশের জোট। তারা পেয়েছে ১৩৪ ভোট আর মরক্কোর ঝুলিতে পরেছে ৬৫ ভোট। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পেল উত্তর আমেরিকা মহাদেশ।
২০২৬ বিশ্বকাপ আরেকটি দিক দিয়েও প্রথম। এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে। ম্যাচসংখ্যা ৮০টি- যার মধ্যে ফাইনালসহ মোট ৬০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। ১০টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে কানাডা ও মেক্সিকোতে।
এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপ হয়েছিল মেক্সিকোতে। ১৯৯৪ সালের আসর বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রে। কেবলমাত্র ২০১৫ সালে মহিলা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হবার অভিজ্ঞতা আছে কানাডার।
২০২৬ সালে হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো খেলবে ৪৮ দেশ। ৩৪ দিনের এই টুর্নামেন্টে হবে মোট ৮০ ম্যাচ। ২৩তম বিশ্বকাপটি হবে মোট ১৬টি শহরে; যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি আর বাকি ৬টি কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে ভাগাভাগি হবে। ফাইনাল হবে নিউ ইয়র্কের ৮৪ হাজার ৯৫৩ আসন বিশিষ্ট মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here