আপেক্ষিক বঞ্চনাতত্ত¡

0
221

 

. এমএ মোমেন

আপেক্ষিক বঞ্চনার পরিণতি কী, তা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানি বর্তমান বাংলাদেশীদের অত্যন্ত ভালো করে জানা। দেশে চলমান রাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকর আন্দোলনটি, এমনকি শুরুর আগেই যারা সমাধান দিতে পারতেন, তাদের সবার জন্ম ১৯৭১এর আগে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশে রূপান্তর করতে তাদের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, আবেগময় সম্পৃক্ততা অনস্বীকার্য।

পশ্চিম পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের মূল ইস্যুটি ছিল বঞ্চনাÍ সংখ্যাগরিষ্ঠকে বঞ্চিত করেছে সংখ্যালঘু পশ্চিম পাকিস্তান; অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়েছে পাকিস্তানের পূর্বাংশ, বঞ্চনা থেকে সৃষ্ট আন্দোলন ১৯৭০এর সাধারণ নির্বাচনে বাঙালিদের নিরঙ্কুশ বিজয় ঘোষণা করেছে; বিজয় থেকেও বঞ্চনা করা হয়েছে, অনিবার্য গন্তব্য হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা।

কার্যত বঞ্চনা একটি ক্ষত, কিন্তু বঞ্চনার অনুভূতি একটি ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র। সেই অনুভূতি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ এনে দিয়েছে।

কাজেই বঞ্চনার অনুভূতি যাতে সৃষ্টি না হয়, আমাদের সেদিকে নজর দেয়া উচিত ছিল, দেয়ালের লিখন পড়া উচিত ছিল, তারুণ্যের নিঃশ্বাস শোনা উচিত ছিল। আমরা নজর দিইনি, পাঠ করিনি এবং শুনিওনি।

আমি সমাজবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানেরদ্য থিউরি অব রিলেটিভ ডেপ্রাইভালÍ আপেক্ষিক বঞ্চনাতত্ত¡ কেমন করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে লাগসই বলে মনে হয়েছে, তার একটি ব্যাখ্যা দিতে চাই।

আপেক্ষিক বঞ্চনাতত্তে¡ শুরুটা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খাইমের (১৮৫৮১৯১৭) হাতে। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন সমরবিদ ওয়াল্টার রান্সিমান তত্ত¡টিকে স্পষ্ট করে তোলেন। সমাজের কোনো একটি অংশ, এমনকি যদি তারা সুবিধাভোগীও হয়ে থাকে, যদি তারা দেখে অন্য একটি অংশ তাদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে, তাহলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে এবং কালক্রমে তা সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। সে আন্দোলন সংস্কারের আন্দোলন হতে পারে, বৈপ্লবিকও হতে পারে। সে আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক হতে পারে, সহিংসও হতে পারে। ওয়াল্টার রান্সিমান অনুসরণে আপেক্ষিক বঞ্চনার একটি সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যায়:

ধরা যাক একজন ব্যক্তি এবং একটি আকাক্সিক্ষত বিষয় কিংবা বস্তু।

একজন ব্যক্তি, যার অধিকারে নেই

অন্যদের চেনে, যাদের অধিকারে আছে

নিজের অধিকারে আনতে চায়

মনে করে, তার অধিকারে আনার যৌক্তিকতা রয়েছে।

যাদের অধিকারে রয়েছে, ‘ নিজেকে তাদের চেয়ে যোগ্যতর মনে করে। কিন্তু তবু প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণেএর অধিকারে আসছে না। সুতরাং অসন্তুষ্ট বঞ্চিত বোধ করছে।এর প্রত্যাশা যখন যৌক্তিক আইনসিদ্ধ, তার প্রতি জনসমর্থন সহানুভূতি ক্রমেই বেড়ে উঠবে। একসময় যৌক্তিক আইনসিদ্ধ বিষয়ের সমর্থকরাওএর পাশে দাঁড়াবে।

সরকারি চাকরিতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি যৌক্তিক আইনসিদ্ধ মনে করেছেন প্রায় সবাই, যদিও অত্যুৎসাহী কেউ কেউ আন্দোলনে বঞ্চনার অনুভূতিবাহী অংশগ্রহণকারীদেররাজাকার কিংবারাজাকারের বাচ্চা বলতে বাদ রাখেননি। এতে ঘৃণা হিংসা আরো বেশি সঞ্চালিত হয়েছে।

যে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া দরকার, তা যতটা না কোটা সম্পৃক্ত, তার চেয়ে বেশি প্রতিবাদবহুল।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পূর্বসূরি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান এবং তারও পূর্বসূরি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের জন্য কোটা নির্ধারিত না থাকলে আমরা হাতেগোনা জন আইসিএম পেতাম: একইভাবে প্রাদেশিক কোটা না থাকলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে হাতেগোনা জন বাঙালির দেখাই মিলত।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য হিসেবে মেধায় চাকরি পাওয়া এবং কোটায় চাকরি পাওয়া পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের জন সদস্যের সঙ্গে চাকরি করার সুযোগ হয়েছে। মেধাবী হিসেবে চাকরিতে এসেছেন এমন একজনকে আমি বলতে শুনেছি, আরে ধ্যাৎ তো প্রভিন্সিয়াল কোটায় চাকরি পেয়েছে।

আমার ব্যাচমেট সমসাময়িকদের মধ্যে কয়েকজন সত্যিই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, জন সার্টিফিকেট জোগাড় করেছেন, তাদের মধ্যে যারা হতভাগা ধরা পড়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান সবার উপরে। নিঃসন্দেহে তাদেরই অবদান আজকের বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার তুল্য কোনো গৌরব অহঙ্কার আমার জানা নেই। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়াটাও তো অহঙ্কারের ব্যাপার হওয়ার কথা। কিন্তু আমার চাকরিজীবনে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিতে আমার সহকর্মীদের একদুজন বাদে কাউকে গর্বের সঙ্গে এটা বলতে বা স্বীকার করতে শুনিনি। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা যখন চাকরিতে ঢুকি, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে নিজেরাও বিব্রত থাকতেন। সম্ভবত সে কারণে তারা মুখও খুলতেন না।

কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিসিএস, কেবল মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বিসিএস এবং চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা তাদের সন্তান, তাদের সন্তানের সন্তান, তাদের সন্তানের সন্তানের সন্তানের জন্য নির্ধারিত ৩০ শতাংশ কোটা তাদের প্রাপ্ত সুবিধার বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আপেক্ষিকভাবে বঞ্চিত করে তুলেছিল। কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি কোটাবিরোধী আন্দোলন ছিল না।আপেক্ষিকভাবে বঞ্চিতরা মহিলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাপ্য কোটার বিরোধিতা করেননি, প্রকাশ্যে যা বলুন, মূলত তা ছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, তাদের সন্তান, তাদের সন্তানের সন্তান প্রমুখের জন্য বরাদ্দ কোটার অবলোপনের আন্দোলন। এটাও অজ্ঞাত ছিল না যে, সুবিধাভোগীদের মধ্যে কেউ কেউ কথিত রাষ্ট্রের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারও সন্তান বটে। আবার একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিন্তু ছাত্রশিবির করছে এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সুযোগসুবিধা পুরোমাত্রায় আদায় করে নিচ্ছে, এমন নজিরও বিরল নয়।

প্রাসঙ্গিক একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। আমি চাকরিজীবনে একটি জেলায় ইউনিয়ন পরিষদ সচিব নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হই। আমরা কঠোরভাবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের ৩০ শতাংশ কোটা রক্ষা করার চেষ্টা করি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডপ্রধানের ছেলেই পদপ্রার্থী। অনেক যোগ্য প্রার্থীকে ডিঙিয়ে আমরা তাকে নিয়োগ দিই। মাস তিনেকের মধ্যেই জেলা কমান্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। নতুন কমান্ডার এসে আমাকে বললেন, আগের জেলা কমান্ডারের পুত্রকে চাকরি দেয়া ঠিক হয়নি, কারণ সেই জেলা কমান্ডার আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। আমি বিব্রত হই এবং সাবেক সংসদ সদস্য রাষ্ট্রদূত ওসমান সারওয়ার আলমকে বিষয়টি বলি। উভয়েই তার পরিচিত। তিনি বললেন, কিছু বলতে তিনিও বিব্রত বোধ করছেন, কারণ দুজনের কেউই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। দুজনই সার্টিফিকেটধারী।

এটি তৃণমূল পর্যায়ের ঘটনা। সিভিল সার্ভিসেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কমতি নেই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের জন্য কোটা হলেও এটি যারা ভোগ করছেন, তাদের কেউ কেউ সুবিধাপ্রাপ্ত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

আপেক্ষিক বঞ্চনাতত্তে¡ আলোকে পরবর্তীকালে যা ঘটার সম্ভাবনা, তা হচ্ছে সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং চিহ্নিতকরণ। এর প্রকৃতি নমনীয় ধরনের নয়Í এর বিরুদ্ধে সোস্যাল মুভমেন্ট বা সামাজিক আন্দোলনের বিশ্বব্যাপী যে ইতিহাস, তা কখনো কখনো সহিংসও।

চলমান কোটা আন্দোলনকে জড়িয়ে অত্যন্ত অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। জনভোগান্তি থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের ধ্বংসযজ্ঞ কোনোটাই সভ্য সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ঘৃণ্য কোনো পরিকল্পনা থেকে উপাচার্য ভবনে পরিচালিত হয়েছে।

আমি স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, সমাজবিজ্ঞানীদের দেখিয়ে দেয়াআপেক্ষিক বঞ্চনা অভিঘাত থেকে আন্দোলনটির সৃষ্টি এবং আন্দোলনের প্রতি অভাবনীয় জনসমর্থন সরকারের কোনো সংস্থাই কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেনি। কিংবা যদি ধারণা দিয়েও থাকে, আমলা প্রশাসন তা গায়ে মাখেনি।

পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকেই এককভাবে তা সামলে নিতে হয়। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন: যখন কেউ কোটা পদ্ধতি চায় না, তখন এটা রাখার আর কোনো দরকার নেই। কোটা ব্যবস্থা বাদ, এটাই আমার পরিষ্কার কথা।

তিনি আরো বলেন, এখন থেকে মেধার ভিত্তিতেই সব নিয়োগ দিতে হবে। তবে পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চাকরির ব্যাপারে আমরা অন্য ব্যবস্থা নেব।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং তাতে সময়ের দাবিই প্রতিফলিত। ভালো সিদ্ধান্তকেও সমালোচক বাঁকাভাবে দেখেন, এটা নতুন কিছু নয়। যারা বলতে শুরু করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সংবিধান পরিপন্থী, তাদের ব্যাখ্যাটি মনগড়া। সংবিধানে যাদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তা বিস্মৃত হননি, তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যভাবে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। তার বক্তব্য কোনোভাবেই বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

যারা আইনের ভয় দেখাচ্ছেন, তারাও ঠিক বলছেন না। উচ্চ আদালতের রায়ে সরকার জনগণের সদিচ্ছারই প্রতিফলন হওয়ার কথা। আইন মন্ত্রণালয়ের অভিমত, অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনাপত্তিÍ এসব প্রসঙ্গ যারা তুলবেন, তারা আশা করি এটা জানবেন এবং মানবেন যে, সরকারের সদিচ্ছা যখন স্পষ্ট, আমলাতান্ত্রিক বাধা তখন তুচ্ছ হয়ে যায়।

রাজনীতিবিদরা তাদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার যে কথাই বলুন না কেন, তাদের এটাও স্মরণ করা দরকার, ১৯৭২এর ১৬ মার্চ গঠিত মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস রিঅর্গানাইজেশন কমিটি প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে কোনো ধরনের কোটা আরোপের বিরোধিতা করেছে। একই সুপারিশ ছিল রশীদ কমিটি এবং এটিএম শামসুল হক কমিটির।

মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিংবা তাদের সন্তানের সন্তানের কোটা প্রথা বলে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার দিন ফুরিয়ে গেছে, এটা নিশ্চয়ই বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পেতে পারে, কারণআপেক্ষিক বঞ্চনা আন্দোলন থেকে সুবিধাভোগীদের যেমন বাঁচিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের জন্যও ন্যায়ানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

চাকরিদর্শনের গোড়ার কথা: যারা চাকরি দাবি করেন তারা নয়, যারা চাকরি পাওয়ার উপযুক্ত, তাদেরই চাকরি দিতে হবে।

এরপর নজর দিতে হবে মানবিকীকৃত সিভিল সার্ভিসের দিকে, সংস্কার চাই সেখানে।

লেখক: সাবেক সরকারি বেসরকারি বিমান কর্মকর্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here