হ-য-ব-র-ল ভাবনা!

0
219

মো. আব্দুল হামিদ

আমরা যখন কাউকে সালাম দিই কথাগুলো কি বুঝে বলি, নাকি নিতান্তইকথার কথা বলে থাকি? সালামের বাণীগুলো সত্যিই হূদয়ঙ্গম করতে পারলে আমরা কি পরিবারের সদস্য আত্মীয়স্বজনদের বারবার সালাম দেয়ার অজুহাত খুঁজতাম না? ক্ষমতাধর উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের উঠতেবসতে সালাম দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলি, অথচ সন্তান মাকে সালাম দিতে দেখলে (অনেকেরই) হাসি পায়! বিষয়ে ভাবতে গিয়ে মনে হলো, যে ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সাক্ষাতে (এমনকি অচেনা হলেও) ‘শান্তি কামনা করে, বিশ্বব্যাপী তারাই আজসন্ত্রাসী বলে গণ্য! অন্যদিকে ট্রাম্পপুতিনরাযুদ্ধ করে এমনই শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন যে, মাঝে মাঝেনোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত জুটে যায়!  

ছোটবেলা থেকে শুনছি (অনেকটা বিশ্বাসও করি), ‘প্র্যাকটিস মেকস ম্যান পারফেক্ট। কিন্তু যখন বড় ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন সামনে আসে, হিসাবটা একেবারে মেলে না! তারা যুগের পর যুগ দিনে ১২১৪ ঘণ্টা লিখছেন অথচ পারফেক্ট তো দূরের কথা, পাঠোদ্ধার করতেই ঘাম ছুটে যায়! আবার আমাদের দেশে সবাই জানে, রান্না মূলত নারীদের কাজ। অথচ আজ পর্যন্ত (বিয়ে, পিকনিক, কুলখানির মতো) বড় কোনো অনুষ্ঠানে রান্নার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনোমহিলা বাবুর্চি সাক্ষাৎ পেলাম না! এমনকি মফস্বলের হোটেল থেকে শুরু করে টমি মিয়া পর্যন্ত সব শেফও পুরুষ মানুষÍ আজব না ব্যাপারটা?

ঠিক তেমনিভাবে প্রতিষ্ঠিত এক ধারণা হলো, আমাদের সমাজপুরুষশাসিত অথচ রাষ্ট্রপতি ব্যতীত প্রায় তিন দশক ধরে আমাদের নির্বাচিত সব বড় পদে (বর্তমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার) নারীরা কৃতিত্বের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন! অন্যদিকে জেন্ডার ইকুয়ালিটির তথাকথিত স্বর্গরাজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজো কিন্তু একজন নারীকে সরকারপ্রধান হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেনি! সিংহভাগ মানুষের বিশ্বাসÍ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী একজন পুরুষ হলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হতে পারতেন না! হিলারি ক্লিনটনের মতো একজন যোগ্য নারী প্রার্থী তারা আগামী কয়েকশ বছরে পাবে কিনা জানি না। তবে আমরা কিন্তু আড়াইশ বছর আগেই (১৭৪৮ সালে) নাটোরের রানী ভবানীকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে প্রমাণ করেছি, যোগ্য নারীদের মর্যাদার আসনে বসাতে আমরা তাদের চেয়ে ঢের এগিয়ে।

গত রাতে পড়ার ঘরে বসেই স্থানীয় এক ওয়াজ মাহফিল শুনতে পাচ্ছিলাম। এক বক্তা হঠাৎ ইহুদি প্রসঙ্গ টেনে এনে ওই জনগোষ্ঠীর কঠোর সমালোচনা করলেন। তখন মনে হলো, আচ্ছা, বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র শূন্য দশমিক শতাংশ মানুষ যা চায়, তা হয়। অথচ আমরা সংখ্যায় দেড়শ কোটির বেশি হয়েও (২৪.%) একপ্রার্থনা ছাড়া কিছুই করতে পারি নাÍ কেন এমনটা হয়? সামনে ফেসবুক খোলা ছিল, হঠাৎ করেই সূত্রটা মিলে গেল! ভাবলামÍ এমন অসংখ্য রজনীর ওয়াজ বনাম জাকারবার্গের একটা সৃষ্টি! মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকার এত আয়োজন, তেমন কাজ হচ্ছে না; অথচ সে কাউকে ডাকছে না, তবু মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটছে! তখন বুঝলাম, লাখো কথার চেয়েও জুতসই একটাকাজ কত বেশি কার্যকর!

ফেসবুক প্রসঙ্গে মনে পড়ল ফেব্রæয়ারিতে শেষ হওয়া বইমেলার কথা। মেলাকে মাঝেমধ্যে ফেসবুকেরবাংলাদেশ সংস্করণ মনে হয়। অর্থাৎ লেখকই যার পাঠক, পাঠকই যার লেখক! ফেব্রæয়ারির কোনো একদিনলেখকমুক্ত দিবস ঘোষণা করলে বোঝা যেত মেলায় প্রকৃত দর্শনার্থীর সংখ্যা কত? অন্যদিকে ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই অনেকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনশট নজরে আসে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, সবার (বিশেষত তরুণদের) ফোনের চার্জ ৩০ শতাংশের চেয়েও কম! আরেকটু যাচাই করে দেখলাম, ঘটনাটা কাকতালীয় নয়। গল্পচ্ছলে এক বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করায় সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘স্মার্টফোন জিনিসটা তরুণদেরই (বড় একটা অংশের) চার্জ ডাউন করে দিচ্ছে, আর তুমি ভাবছ ফোনের চার্জ নিয়া!’

ইউরোপআমেরিকায় গায়ের রঙ একটু বাদামি করার আশায় অনেকে সমুদ্রসৈকতে সারা দিনস্কিন বার্ন করে। আমাদের দেশে পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টোটা। গাছের ছায়ায়ও অনেকের ছাতা খোলা থাকে, রোদ যেন কোনোভাবেই চামড়া পর্যন্ত ঘেঁষতে না পারে! সম্ভবত বিষয়টাকে পুঁজি করে এক কোম্পানি তাদের পণ্য বেচার জন্য দাবি করেÍ দুবাই, সিঙ্গাপুর আর জাপানের ক্রিমকে হারিয়ে তাদের ব্র্যান্ডটি সেরা হয়েছে! আচ্ছা, কারা ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক ছিলেন? বিচারক ছিলেন কারা, অংশ নিয়েছিল কোন দেশের কতটা ব্র্যান্ড? তাছাড়া এমন একটাচ্যাম্পিয়ন ক্রিম ধনী দেশগুলোর ক্রেতাদের টার্গেট না করে আমাদের বস্ত্রবালিকা জরিনা, সখিনা, আম্বিয়াদের গায়ের রঙ ফর্সা করার জন্য উঠেপড়ে লাগল কেন; যাদের (অনেকেরই) কিনা আয় দিনে ডলারেরও কম!   

দিনবদলের হাওয়ায় আমাদের তরুণতরুণীরাওস্বাধীন হচ্ছে। তারা কথায় কথায় মাবাবাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সে এখন বড় হয়েছে। অর্থাৎ সে কী করবে নাকরবে, কখন কীভাবে করবে,এসব বিষয়ে তারব্যক্তিস্বাধীনতা হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সম্ভবত ইউরোপআমেরিকায় এমনটা হয় বলে শুনেছে, তাই নিজেরাও সেটা ভোগ করতে উদ্যত। কিন্তু একটা বিষয় তারা মোটেই খেয়াল করে না, ওইসব দেশে মাবাবার যত ধনসম্পদই থাকুক না কেন, তরুণতরুণীরা ১৬ বছর বয়স হলেই কাজ খুঁজতে শুরু করে।

স্বপ্ন দেখতে থাকে, যেদিন ১৮ বছর পূর্ণ হবে, সেদিনই নতুন বাসায় উঠবে; বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে সেখানে নিজের মতো বসবাস করবে। সেজন্য কাজ খুঁজতে তারা ক্রমেই মরিয়া হয়ে ওঠে। সেটা ড্রাইভিং, শপিংমলের সেলসম্যানশিপ, রেস্টুরেন্টের বেয়ারাগিরি, এমনকি ট্রেনবাসে গান শুনিয়ে, জাদু দেখিয়ে যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে তৎপর থাকে। বয়স ১৮ বছর হওয়ার পরে প্রায় সবাই সেটা করেও থাকে। অথচ আমাদের সন্তানরা স্বাধীন হতে চায় মাবাবার পয়সায়! একই আকাক্সক্ষা শিল্পোন্নত দেশে তাদের কর্মঠ করে তুলছে আর আমাদের বানাচ্ছে অলসকুঁড়ে, তাই না

শোবিজের মডেলরাতারুণ্য ধরে রাখতে নিঃসন্দেহে কঠোর পরিশ্রম করেন। পেশার চাহিদা মোতাবেক সেটা করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝেমধ্যে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি, টিভি বিজ্ঞাপনে মডেলের গেটআপ একজন তরুণীর, অথচ শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনে ক্লাস ফোর/ফাইভে পড়া শিশুর মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে! দেখে ভাবি, খুব সম্ভবত মেয়েটার বাল্যবিবাহ হয়েছে, নইলে বয়সে এত বড় সন্তানের মা হয় কী করে! অভিনয়শিল্পীরা হয়তো সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না বলে যেকোনো কাজ করতে রাজি হন কিন্তু নির্মাতাদের চোখেও কি বিষয়টাঅস্বাভাবিক লাগে না?

প্রসঙ্গে মনে পড়ল, স্কুল থেকে চারপাঁচ বছর বয়সী শিশুর ডায়েরিতে প্রতিদিন লিখে দেয়া হয়,বাসায় শিখবে! যদি বাসায় শেখাই নিয়ম, তবে স্কুলে তারা কী শিখছে? পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় বইখাতা বাসায় নেয়া নিষিদ্ধ; কোমলমতি শিশুদের লিখিত কোনো পরীক্ষাও হয় না! আমার জানামতে, কোপেনহেগেনে বসবাসকারী এক বাংলাদেশী অভিভাবক চেষ্টা করেছিলেন সন্তানের বইয়ের এক সেট ফটোকপি ম্যানেজ করতে। কর্তৃপক্ষ জানার পরে সতর্ক করে বলেছে, বাসায় শিশুকে পড়ার জন্য চাপ দিলে তারা পুলিশকে অবগত করতে বাধ্য হবে! অর্থাৎ ওই বয়সে যা শেখা দরকার, তার জন্য স্কুলই যথেষ্ট। অথচ আমরা? অবুঝ শিশুদের বিদ্যাসাগর বানাতেদুর্বহ সব বিষয়বস্তু তাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছি। হয়তো সে কারণেই এক যুগের বেশি সময় বাধ্যতামূলকভাবে পড়ার পরেও (অধিকাংশ শিক্ষার্থী) দুই লাইন ঠিকমতো ইংরেজি বলতেও পারে না, লিখতেও কষ্ট হয়!

অন্যদিকে উৎপাদন, মজুদ বণ্টনের প্রতিটি ধাপে খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত সব বস্তু মিশিয়ে আমরা যেন পুরো জাতি আত্মাহুতি দেয়ার পণ করেছি। যে চীন সব ধরনের পণ্য উৎপাদনে দুই নম্বরির ওস্তাদ, তারাও খাদ্যে ভেজাল দেয়াকেপ্রিন্সিপাল ক্রাইম হিসেবে গণ্য করে জাতীয় অপরাধে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। অথচ আমরা? চালডাল, মাছমাংস, ফলসবজি, ডিমদুধ সবকিছুতে নির্বিকারভাবে ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ করছি। ফলে নানা জটিল রোগে ভুগছি, মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সবকিছুকে নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছি। মরণ খেলা সহসা থামবে বলে আশাও করতে পারছি না। কারণ রাশ টানার নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ!

আমাদের দেশে একজন মানুষের বয়স ৬০ বছর হলেই তাকে রেগুলার কাজকর্মের অনুপযোগী ভাবা হয়। তাই শারীরিকভাবে সুস্থসবল থাকা সত্তে¡ তাদের অবসরে পাঠানো হয়। অথচ বিস্ময়করভাবে সেই মানুষটাই রাজনীতির মাঠে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি ফিট হয়ে যান! ছোট্ট একটা দপ্তর বা সেকশনের দায়িত্বও সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ করতে পারবেন না বলে যাকে বাড়িতে পাঠানো হলো, সেই মানুষটাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দাপটের সঙ্গে পালন করার সক্ষমতা দেখান! তাহলে কিঅবসরের বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়েছে, নাকি অন্য কিছু?

ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কৃষকের সন্তান কিংবা স্টিভ জবস তরুণ বয়সে অর্থাভাবে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতেন, বন্ধুর বাবার পরিত্যক্ত গ্যারেজে রাত কাটাতেনÍ এমন তথ্য আমাদের অনেককেই বেশ আন্দোলিত করে। খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি, অন্যদের সঙ্গে গল্প করি, সংশ্লিষ্ট লিংক আবেগভরা মন্তব্যসহ শেয়ার দিই। অথচ আমাদেরই কোনো এক সহকর্মী বা সহপাঠী এমন সংগ্রাম করে ভালো কিছু করছে জানামাত্রই বলে উঠিÍ জানতাম তো, সে একটা ছোটলোক/চাষার বাচ্চা! যে ব্যক্তি আবেগতাড়িত হয়ে প্রায়ই দেশবিদেশের এমন উদাহরণ দেন, মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে এমন একটা ছেলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসায় তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন! হয়তো বাংলা সিনেমার স্টাইলে বলেও বসেনÍ ফকিন্নির পুতের সাহস কত, আমার মাইয়ার দিকে চোখ তুইলা চায়!

শোনা যায়, পৃথিবীর অন্য ভাষায়পরশ্রীকাতরতা সমার্থক কোনো শব্দ নেই। দাবি কতটা সঠিক তা জানি না; তবে উচ্চপদে চাকরি, লটারিতে বড় পুরস্কার কিংবা যোগ্য পাত্রপাত্রীর সঙ্গে বিয়ের মতো ঘটনা অপরিচিত কারো জীবনে ঘটলে আমাদের মোটেইখারাপ লাগে না। কিন্তু সেই সফলতা যদি পরিচিত কেউ পায়, তখনমানতে খুব কষ্ট হয়!’ এমনকি তার সম্পর্কে দুচারটা নেতিবাচক তথ্য শেয়ার করে সে যে অর্জনের জন্য মোটেও যোগ্য নয়, তা প্রমাণেও হয়ে উঠি তৎপর। আমার পরিচিত কেউ সফল হয়েছে, বড় কিছু অর্জন করেছে, তাতে আমারই তো সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়া উচিত ছিল, তাই না? হয়তো রকম হাজারো বৈপরীত্য দেখেই আলেকজান্ডার তার সেনাপতিকে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পিএইচডি ফেলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here