খালেদার সুস্থতা-অসুস্থতা : কি হচ্ছে কারা অন্তরালে

0
224

 

শিহাব সরকার: : কারাবন্দী খালেদা জিয়া সুস্থ নাকি অসুস্থ? নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সরকার, কারা কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, বিএনপি দুদকের আইনজীবীদের বেশ দিন ধরে নিয়ে নানামুখী বক্তব্যে সাধারণ মানুষের কৌতূহল আরও বেড়েছে। এর মধ্যে শনিবার হঠাৎ বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএম) আনা হলো। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ফের কারাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষানিরীক্ষার রিপোর্ট রোববার কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায় বিএসএমএম কর্তৃপক্ষ। 

পরে কারা কর্তৃপক্ষের গঠিত মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার কিছু শারীরিক সমস্যার কথা জানান মেডিকেল বোর্ডের প্রধান।

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই নিঃশর্ত মুক্তির দাবিও জানিয়ে আসছে বিএনপি। কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেখালেদা জিয়া অসুস্থ…’ –এমন বক্তব্যের পর থেকেই বিষয়টি রহস্যজনক হিসেবেও দেখছে দলটি। বিএনপি বলে আসছে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়ার সুযোগ দিতে, তাছাড়া তিনি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিদেশেও চিকিৎসা নেন। তিনি সত্যিই অসুস্থ হলে তাকে মুক্তি দেয়া হোক। যাতে তিনি স্বাধীনভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন।

কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কখনো বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে চাইলেপেরোলে মুক্তি দেয়া হবে। মন্ত্রীদের কেউ বলছেন, প্রয়োজন হলেসরকার খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাবে আবার বলা হচ্ছে, ‘জেল কোড অনুযায়ী খালেদা জিয়া চিকিৎসা পাবেন। তিনিসুস্থ আছেন, –সরকারের পক্ষ থেকে এমন নানামুখী বক্তব্য দেয়ায় বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘খালেদা জিয়াকে অসুস্থতার কথা বলে সরকার মূলত তাকে বিদেশে পাঠিয়ে ফের এক তরফা নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের নিয়ে কৌতূহলের অবসান হচ্ছে না। নানা নাটকীয়তায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর মধ্যেও সন্দেহ, সংশয় কিছুটা উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বেগম জিয়াকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আনা হয়, তখন তিনি গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে মেডিকেলের লিফটের কাছে যান। লিফট থেকে নেমে হেঁটেই যান নির্ধারিত ভিভিআইপি কেবিনে। পরে ক্সে জন্য তাকে নেয়া হয় রেডিওলোজি বিভাগে। সেখানেও হেঁটেই গেলেন বেগম খালেদা জিয়া। সময় অসংখ্য গণমাধ্যম তার ছবি নেয়। যা জাতীয় দৈনিক অনলাইনে প্রকাশ পায়। একই সাথে দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনানেয়া, গাড়ি থেকে নামাউঠা, লিফটে উঠানামা, রেডিওলোজি বিভাগে হেঁটে যাওয়াসহ পুরো বিষয়টি লাইভ সম্প্রচার করে।

গণমাধ্যমের ছবি ভিডিও দেখে অনেকে বলেছেন, খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হলেও দেখে মনে হয়েছে তিনি ভালো আছেন। তিনি মানসিকভাবে বেশ দৃঢ় আছেন। নৈতিক শক্তির কারণেই ৭৩ বছর বয়সে নির্জন কারাগারে থাকার পরও মানসিকভাবে দৃঢ় আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তার মনোবল দলের নেতাকর্মীদেরকেও বেশ সাহস যুগিয়েছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

মেডিকেল বোর্ড যা বলছে

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার এখনই বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি বলে মনে করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক মো. শামছুজ্জামান। তিনি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান।

মো. শামছুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, কারাগারে আসার আগে থেকেই তাঁর আরথ্রাইটিসের সমস্যা ছিল। এখন সেই সমস্যা কিছুটা বেড়েছে। তাঁর বাঁ পা বাঁ হাতে একটু ব্যথা হয় এখন। যেহেতু বাঁ পাশে ব্যথা, তাই ধরে নেয়া যায় তাঁর কোমরে কিছুটা সমস্যা আছে।

গত ফেব্রæয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিশেষ আদালত তাকে পাঁচ বছর সাজা দেয়ার পর থেকে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। দুই মাসের মাথায় শনিবার তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে আনা হয়। এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হয়। সামনে পেছনে ছিল ্যাবের পাহারা। পুলিশের কালো রঙের একটি গাড়িতে করে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়।

গত ২৮ মার্চ একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে আদালতে উপস্থিত করার কথা ছিল। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তিনি অসুস্থ বলে তাকে আদালতে উপস্থিত করেনি। ওইদিন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি আবদুল্লা আবু গণমাধ্যমকে জানান, খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করতে না পারায় কারা কর্তৃপক্ষ কাস্টডি ওয়ারেন্ট পাঠিয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাই খালেদা জিয়াকে আদালতে আনা হয়নি।

মেডিকেল রিপোর্টে খালেদা জিয়ার ঘাড়ে, কোমরের হাড়ে সমস্যা পাওয়া গেছে

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের প্রধান মো. শামছুজ্জামান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, বেগম জিয়ার ঘাড়ে কোমরের হাড়ে কিছুটা সমস্যা আছে। তবে রক্তের রিপোর্টগুলো ভালো, স্বাভাবিক আছে। মো. শামছুজ্জামান বলেন, খালেদা জিয়ার রক্ত পরীক্ষা এক্সরে রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। তাঁর এক্সরে রিপোর্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে কোমরে ঘাড়ের হাড়ে কিছুটা সমস্যা আছে। রক্তের রিপোর্টগুলো খুবই ভালো আছে। বয়সের কারণে উনার এই অসুস্থতা।

গত ফেব্রæয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছর সাজা পেয়ে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। দুই মাসের মাথায় এপ্রিল চিকিৎসার জন্য তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আনা হয়।

এর আগে এপ্রিল খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গঠিত বিশেষ মেডিকেল বোর্ড কারাগারে গিয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। পরদিন বোর্ডের সদস্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক মো. শামছুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ, তবে গুরুতর নয়।

খালেদা জিয়া যে কোনও সময় হার্ট অ্যাটাকপক্ষাঘাতে আক্রান্ত হতে পারেন

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বিরূপ নিপীড়নমূলক পরিবেশে রাখার ফলে তার আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি বিভাগের সাবেক ডিন প্রফেসর ডা. সাইফুল ইসলাম।

তিনি জানান, সূর্যের আলো ছাড়া স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বিএনপি চেয়ারপারসনের ভয়ঙ্কর মাত্রার ভিটামিনডি ক্যালশিয়ামের শূন্যতা দেখা দিতে পারে,যা তার হাড়ের জন্যে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এই বয়স স্বাস্থ্যগত অবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচর্যার বিষয়টি সুচিকিৎসার স্বার্থেই গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে এবং তা কেবল পারিবারিক ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নিশ্চিত করা সম্ভব। খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই কারাগারের বসবাস অযোগ্যতা ছাড়াও নিয়মিত চিকিৎসার কোনও সুযোগসুবিধা নেই। তাই বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে তাঁর সুচিকিৎসার অধিকারের বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে।

সোমবার ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য চিকিৎসা নিয়ে আপডেট জানাতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকেরা বয়সজনিত নানা রোগে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেকোনও সময় আঘাতজনিত পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আগে থেকে বেশ কিছু ক্রনিক রোগে ভুগছেন বেগম খালেদা জিয়া। নতুন করে ঘাড়, মেরুদÐ স্নায়ুবিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি। মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকেরা তার রোগ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তারা নতুন করে চিকিৎসা শুরু করেছেন। তারা মামুলি কিছু পরীক্ষা যেমন রক্ত এক্সরে করতে দিয়েছেন। ধরনের পরীক্ষা দিয়ে একজন বয়স্ক মানুষের রোগ নিরূপণ করা যাবে না। এমআরআই, সিটি স্ক্যান করে দেখতে হবে তার শরীরে কী ধরনের অর্থোপেডিক নিউরোলজিক্যাল সমস্যা তৈরী হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার লিভার, কিডনি, ফুসফুস, হাঁটু কী অবস্থায় তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। মুলত: বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষাটা ছিল একেবারেই লোক দেখানো। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা তার সাথে থাকলেও তাদের কোনো পরামর্শ নেয়া হয়নি। অথচ তারাই জানেন, কীভাবে চিকিৎসা করতে হবে, তার কী প্রয়োজন। ফলে সরকার বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল তার চিকিৎসার ব্যাপারে যতœবান প্রমাণ করতে হলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের ভূমিকা উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। বিষয়টি উপেক্ষা করলে সব পরিণতিতে সরকারের দায়ী হওয়ার প্রমাণ মিলবে।

চিকিৎসকদের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, বয়সজনিত নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত একজন বয়স্ক নারীর এই নির্জন মানবেতর করাবাস স্বাস্থ্য স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে, তা সাধারণ মানুষকেও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, এই পিচ্ছিল স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে যেকোনও সময়ে পড়ে গিয়ে তার হাটু, উরুসন্ধি, হাত মেরুদÐের হাড়ভাঙাসহ মস্তিষ্ক স্পাইনাল কর্ডে আঘাতজনিত পক্ষাঘাত রোগ ঘটতে পারে। নির্জন, নিঃসঙ্গ, নিরাপত্তাহীন পরিবেশের কারণে নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগ, বিষন্নতাসহ নানা মানসিক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ার সম্ভবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ডা. সাইফুল ইসলাম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে আরও বলেন, বিরূপ, নিপীড়নমূলক পরিবেশ অস্বাভাবিক মানসিক চাপের ফলে খালেদা জিয়ার আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরনো, পরিত্যক্ত দূষণযুক্ত ভবনের বিষাক্ত পরিবেশে তার মারাত্মক ওষুধপ্রতিরোধী জীবাণু দ্বারা ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার সম্ভবনা বেশ প্রবল হয়ে উঠতে পারে।

এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেবশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক, মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক ডা. মান্নান মিঞা, অধ্যাপক ডা. মো. সাহাব উদ্দিন, অধ্যাপক ডা. শহিদুর রহমানঅধ্যাপক ডা. এম সালাম,অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবির লাবু, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. আব্দুল কুদ্দুস, অধ্যাপক ডা. মোস্তাক রহিম স্বপন, অধ্যাপক ডা. কে এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু প্রমূখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here