কোটা পদ্ধতি বাতিলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার নেপথ্যে

0
115

তারেক রহমানের বার্তা,পর্দার অন্তরালের নড়াচড়া, নজীরবিহীন বিক্ষোভ
নাসিরা আফরোজ রোজী: মাত্র এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারী চাকুরীতে বিদ্যমান কোটার পক্ষে জোরাল বক্তব্য রাখেন। তখনও আন্দোলন তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। দেশব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদেও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনি মন্ত্রীসভার বৈঠকে তিনি জোরাল কণ্ঠে বলেন, কোটা যেমন আছে তেমনই বহাল থাকবে। তার মন্ত্রীসভার সদস্যরাও জোর গলায় কোটার পক্ষে অবস্থান নেন। দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ বিভিন্ন স্থানে কোটা বিরোধী সভা-সমাবেশ মিছিলে আক্রমন চালায়।

এমনকি সরকার দলীয় সমর্থক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি সকলেই কোটা বিরোধী আন্দোলনের সমালোচনা করেন। মাত্র দু’দিন আগে সংসদে মন্ত্রী-এমপিরা কোটার বিপক্ষে আন্দোলনকারীদের তীব্র ভাষায় আক্রমন করেন। কৃষি মন্ত্রী মহিয়া চৌধুরী এককাঠি বাড়িয়ে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদেও রাজাকারের বাচ্চা বলে জালি দেন। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ভিসি, সরকার সমর্থিত শিক্ষক সমিতি-সকলেই কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের তীব্র সমালোচনা করেন। ছাত্রলীগ কর্মীরা পিস্তল-রামদা যার যা আছে তাই নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। তবে মাত্র এক রাতের ব্যবধানে সব কিছু যেন উল্টে গেল। কোটা বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়েছে, সারাদেশে উত্তাল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সেই সাথে পার্দার অন্তরালেও আরো বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল। এ প্রেক্ষিতেই যেন রাতারাতি সরকারের অবস্থান একেবারেই উল্টো। ছাত্রলীগ- বিলোধীতা ছেড়ে আšেদালনকারীদেও সমর্থন দিল। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ভিসি, সরকার সমর্থিত শিক্ষক সমিতি -সকলেই কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে সমর্থন দিলেন। এমনকি বিদ্যমানটানা চারদিনের আন্দোলনের মুখে সংসদে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোটা রাখলে এভাবে বার বার আন্দোলন হবে। কোটা পদ্ধতিরই দরকার নেই। যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-প্রতিবন্ধী তাদের অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর চলাকালে জাহাঙ্গীর কবির নানক কোটা সংস্কারে আন্দোলনের প্রসঙ্গ এনে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চান।

প্রধানমন্ত্রী যে সেচ্ছায় কোটা বাতিলে এগিয়ে আসেননি বাধ্য হয়েই তা মেনে নিচ্ছেন- এই ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি তা রাখঢাক করেন নি। সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার সময় তার কন্ঠে যে তীব্র ক্ষোভ তার শতভাগ প্রকাশ পেয়েছে।
কি ঘটল এই এক রাতে। সরকার তার অবস্থানের একদম বিপরীত অবস্থানে যেতে বাধ্য হলেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একদিকে আন্দোলনকারীদেও নজীরবিহীন বিক্ষোভ অন্য দিকে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়াপার্সন তারেক রহমানের একটি টেলিফোন নির্দেশ সরকারকে বেকায়কায়দায় ফেলে দেয়। গোয়েন্দা রিপোর্টে এমন কিছু ছিল যার ফলে এমনকি সরকার এই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর ভয়েও ভীত হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় পর্দার অন্তরালে আরেকটি শক্তিশালী মহলও দেশের এই অবস্থার সুযোগ নেওয়ারও তৎপরতা শুরু হয়। ফলে, শীর্ষ-নীতিনির্ধারকদেও পরামর্শে দ্রæত এই আন্দোলনের প্রতি সরকার সমর্থকদের সমর্থন দিতে বলা হয় যাতে অন্তত মুখ রক্ষা হয়। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য- তড়ি-ঘড়ি কওে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষনা দেন। মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যেই সব বদলে গেল।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, খুব দুঃখ লাগে যখন দেখলাম, হঠাৎ কোটা সংস্কারে আন্দোলন। এ আন্দোলনটা কী? সমস্ত লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় বসে থাকা। রাস্তায় চলাচল বন্ধ করা। এমনকি হাসপাতালে রোগী যেতে পারছে না। কর্মস্থলে মানুষ যেতে পারছে না। লেখাপড়া বন্ধ, পরীক্ষা বন্ধ, সব বন্ধ করে বসে গেছে। এই যে ঘটনাটা এবং এটা মনে হলো যেন সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। ডিজিটাল বাংলাদেশ আমিই গড়ে তুলেছিলাম। আজকে ইন্টারনেট, ফেসবুক বা ইউটিউব যাই ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো তো আমাদেরই করা। বাংলাদেশকে আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা দেবো, সেই শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই শিক্ষা গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না হয়ে, এখন সেটা ব্যবস্থা হচ্ছে কী? এখন সেটা গুজব ছড়ানোর একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। একটা ছেলে তার মাথায় আঘাত লেগেছে। হঠাৎ একজন তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দিলো যে, সে মারা গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা সব বেরিয়ে গেল। এমনকি মেয়েরা। আমরাও ছাত্র ছিলাম, দেখি নাই। রাত্রি একটার সময় হলের গেট ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। শুধু একটা গুজবের ওপর। এই যে, মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে, এরপর যদি কোনো অঘটন ঘটতো তার দায়দায়িত্ব কে নিতো? এটা কি একবার কেউ চিন্তা করেছে? আর সব থেকে ন্যক্কারজনক ঘটনা হলোÑ ভিসির বাড়িতে আক্রমণ।
কাজেই কোটা পদ্ধতি থাকারই দরকার নাই। আর যদি দরকার হয়, দেখবেন আমাদের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি তো আছেন। তাকে তো আমি বলেই দিয়েছি, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে তারা কাজ করবে, তারা দেখবে। কিন্তু আমি মনে করি, এরকম আন্দোলন বারবার হবে। বারবার শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটবে। এই যে পরীক্ষা নষ্ট হলো। যেখানে আজ পর্যন্ত একটা সেশন জট ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে তারা চাকরি পেতো। বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করেছি, সেখানে চাকরির সুযোগ আছে। অথচ এই কয়েকদিন ধরে সমস্ত ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ। তারপর আবার ভিসির বাড়ি আক্রমণ।রাস্তাঘাটগুলোতে যানজট। মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন? এই বারবার কষ্ট বন্ধ করার জন্য আর বারবার এই আন্দোলন ও ঝামেলা মেটানোর জন্য কোটা পদ্ধতিই বাতিল। পরিষ্কার কথা। আমি এটাই মনে করি, সেটা হলেই ভালো।
লুটপাট হওয়া মালামাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দিতে হবে
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, হামলা-ভাঙচুরে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেখান থেকে লুটপাট হওয়া মালামাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে দিতে হবে। ভিসির বাড়ি ভাঙা, রাস্তায় আগুন দেয়া, এমনকি পহেলা বৈশাখ। সবসময় চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে অনেক কিছু তৈরি করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। যেই মঙ্গল শোভাযাত্রা আজকে আমরা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে যেটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই জিনিসগুলো পুড়িয়ে টুড়িয়ে, ভেঙেটেঙে সব তছনছ। এটা কি ধরনের কথা? ছাত্ররা এরকম ধ্বংসাত্মক কাজ করবে কেন? আর মেয়েরা যে হল থেকে বেরিয়ে চলে আসলো, এই গভীর রাতে, আমি সারারাত ঘুমাতে পারি নি। আমি বার বার ফোন করেছি। আমি সাথে সাথে নানককে পাঠিয়েছি। সে ওখানে গেল, ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারিসহ। তাদের সঙ্গে কথা বললো। প্রেসকে বললো যে, আমরা এটা নিয়ে দেখছি। তোমরা এভাবে ভাঙচুর করো না। আগুন দিও না। তাদের ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলো। তারপরও তারা কোনো কিছুই মানবে না। এবং তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি- বেসরকারি এমনকি ঢাকার বাইরে সব রাস্তায় নেমে গেছে। কি? কোটা সংস্কার। এটা কিন্তু একবার না। এ ধরনের কোটা সংস্কার আরো অনেকবার এসেছে। এবং বার বার এটাকে সংস্কার এটা সেটা করা হয়েছে।
নজীরবিহীন বিক্ষোভ
এক অন্যরকম বিক্ষোভের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। নানা কর্মসূচি। দাবি কোটা সংস্কারের। রোববার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগে অবস্থান। যদিও এটা অন্য এক শাহবাগ। বাধা দেয়ার চেষ্টা পুলিশের। সন্ধ্যা নামতে নামতে অ্যাকশন। শাহবাগের দখল ছাড়লেও ক্যাম্পাসের দখল ছাড়েননি বিক্ষোভকারীরা। তাদের ওপর নির্বিচারে টিয়ার শেল আর রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয় বিক্ষোভকারীরা। মিনিট বা ঘণ্টার ছবি এটি নয়। এ দৃশ্য পুরো রাতের। আতঙ্ক জাগানিয়া এক রাত। বেনজির সংঘর্ষ। নানা গুজব। দৃশ্যপটে আবির্ভাব ছাত্রলীগের। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা। কোনো কিছুতেই টলানো যায়নি তাদের। গভীর রাতে শ’ শ’ ছাত্রী যোগ দেন বিক্ষোভে। যে দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। ঢাবি ভিসির বাসাতেও হয় নজিরবিহীন হামলা। রাতভর সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ আহত হন দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। গ্রেপ্তারের শিকার হন অনেকে।
আতঙ্ক, উত্তেজনা আর সংঘর্ষের রাতের পর নতুন সূর্য। পুলিশের অ্যাকশনে কিছুটা বিরতি। ফের আন্দোলনকারীদের দখলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল সকাল এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে। ক্যাম্পাস থেকে ক্যাম্পাস। তারুণ্যের প্রতিবাদ। বড় বড় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই যোগ দিয়েছেন এ বিক্ষোভে। ক্ষমতাসীনদের টানা প্রায় দশ বছরের মেয়াদে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।
আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান মানবজমিনকে বলেন, ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীর দাবি হলো কোটা বাতিল করা। আমরা অহিংস পদ্ধতিতে সে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।
রোববার রাতে পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। গুলি, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে ২১৭ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জন ছাত্রী। পুলিশি হামলা থেকে আত্মরক্ষার্থে শিক্ষার্থীরা ঢাবির বিভিন্ন স্থাপনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানে ঢুকে তাদেরকে মারধর করেছে পুলিশ। অথচ আমাদের দেশের ৯৫ ভাগ মানুষের সমর্থন আছে কোটাবিরোধী এই আন্দোলনে।
বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আহত মো. আবুবকর ছিদ্দিকের চোখে রাবার বুলেট লেগেছে। তিনি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর হলে চলে যান বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থী সোহেল রহমান।
রোববার রাতে পুলিশ ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রবেশ করে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে তার প্রতিবাদ জানাতেই মৌন মিছিল করছি। এ সময় মুজাহিদ নামে এক শিক্ষার্থী জানায় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের দুই শিক্ষার্থী রাকিবের মাথায় রাবার বুলেট ও সালামের চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। তারা দুজনেই ক্যাম্পাসের ভেতরে ছিল, হঠাৎ করে পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি নির্যাতনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
বিক্ষোভের উত্তাল ঢেউ
দু’দিন বুধবার এ যেন উত্তাল তরঙ্গ। শুরু আছে শেষ নেই। মিছিলের সব হাত-পা-কণ্ঠ একই। কোটা সংস্কারের দাবিতে ¯েøাগানে ¯েøাগানে মুখর রাজপথ। শুরুটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর ক্রমশ এতে যোগ দিয়েছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী।
টানা চতুর্থ দিনের বিক্ষোভে বুধবার উত্তাল ছিল সারা দেশ। ৫ দফা দাবিতে বুধবার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন, অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। বিভিন্ন সড়ক আটকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানচলাচল বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। টানা চার দিনের এ আন্দোলনে বুধবার ছিল ভিন্নমাত্রা। সরকারি আশ্বাসের পরের বিভক্তি এবং একদিন পর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণায় দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে অংশ নেন। চতুর্থ দিনে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এদিকে দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বক্তব্য দিলেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিতের কোনো ঘোষণা দেননি। তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পর্যালোচনা করে আজ সিদ্ধান্ত জানাবেন।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার সকাল দশটার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় অবস্থান নিয়ে দাবির পক্ষে ¯েøাগান দিতে থাকেন। হাতে পতাকা, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার। অনেকের শরীরে শোভা পায় প্রতিবাদের কথামালা। রাস্তার কালো পিচে কোটাবিরোধী লেখা। এতে অচল হয়ে পড়ে পুরো রাজধানী। দিনভর ছিল এমন অবস্থা।
ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাজধানীর বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি-বেসরকারি কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ব্যাপক সংখ্যায় রাস্তায় নেমে পড়ে। এই পরিস্থিতি সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। বিকাল থেকে কমতে থাকে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটা বাতিলের ঘোষণার পর দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হলে শিক্ষার্থীরা অবস্থান ছাড়েন।
আন্দোলনকারীদের দখলে ঢাবি: কোটা সংস্কার আন্দোলনের চতুর্থ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছিল বিক্ষোভে উত্তাল। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় ঢাবি এলাকা যেন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিএসসি মোড়ের উত্তাপ আরো বেড়ে যায়। একের পর এক ¯েøাগান আর আলাদা আলাদা হলের মিছিল ঢাবি’র বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন করেছে বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্টসহ আরো একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীর নর্দা-কুড়িল রোড অবরোধ করে আন্দোলন করে। অন্যদিকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রামপুরা ব্রিজের কাছে অবস্থান নিয়ে অবরোধ তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিনভর বন্ধ থাকায় দুর্ভোগের সীমা ছিল না সাধারণ যাত্রীদের। এদিকে মহাখালী থেকে সাতরাস্তাগামী সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের অবস্থানে ওই সড়কেও যান চলাচলে বিঘœ ঘটে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালরয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরান ঢাকা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে রায়সাহেব বাজার হয়ে তাঁতীবাজারে আসেন তারা।
মতিয়া চৌধুরীর উক্তি ও আন্দোলনের ঐক্য
সংক্ষুব্ধ ছাত্রদের বিভক্তি দূর হলো কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া-না-যাওয়া নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একটা বিভক্তি তৈরি হলেও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর এক উক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে আবার এক হয়ে গেছেন তারা। এর আগে যে নেতারা সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে বৈঠক করার পর আন্দোলন স্থগিত করেছিলেন -তারা আবার আন্দোলনে ফিওে আসেন।
রোববার ছাত্র অধিকার পরিষদের যে নেতারা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিলেন তারা সরকারের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে বিক্ষোভ স্থগিত করেছিলেন। কিন্তু এ সমঝোতা বিক্ষোভরত ছাত্রদের একাংশ মেনে না নিলে দৃশ্যত: ছাত্র অধিকার পরিষদেই একটা বিভক্তি দেখা দেয়।
মঙ্গলবার সকালে আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরোধী একদল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেন। এদের মধ্যে একজন ছাত্রী বলছিলেন, সরকারের বক্তব্যে তারা ভরসা পাচ্ছেন না এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান।
তারেক রহমানের বক্তব্য
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারার্সন তারেক রহমান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ড. মামুন আহমেদের ফোনালাপ করে লন্ডনে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবীর পাশে দাঁড়াতে বলেন। কোটা সংস্কারের দাবী তে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সমিতিকে একাত্মতা জানানোর তারেক রহমান এবং ঢাবির শিক্ষক অধ্যাপক মামুনের এই অডিও আলাপ হয়।
ফোনালাপটি তুলে ধরা হলো :
তারেক রহমান: -হ্যালো, জি আসসালামু আলাইকুম জি মামুন সাহেব বলছেন,
ড. মামুন আহমেদ : জি বলছি
তারেক রহমান: আমার নাম তারেক রহমান। আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছেন?
ড. মামুন আহমেদ : আসসালামু আলাইকুম, জি আমি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?
তারেক রহমান : আছি আলহামদুলিল্লাহ মোটামুটি।
ড. মামুন আহমেদ : আপনার শরীর কেমন?
তারেক রহমান : শরীরও আছে মোটামুটি। আমি ফোন করলাম এই যে ছেলেপেলেরা যে এই কোটা বাতিলের জন্য বা সংস্কারের জন্য যে আন্দোলনটা করছে…।
ড. মামুন আহমেদ : জি
তারেক রহমান : দাবিটা তো জেনুইন। দেশের অধিকাংশ স্টুডেন্ট যারা মেধাবী বলে স্বীকৃত তারা অধিকাংশই তো মনে হয় এটার সাথেই আছে তাই না। এবং আমার মনে হয় সাধারণ মানুষও আছে। কারণ এই কোটা পদ্ধতিটাকে গত কয়েক বছরে বলা যায় আওয়ামী লীগ নষ্ট করে দিয়েছে। আমার মনে হয় এই দাবিটা ন্যায্য দাবি। তো এখান থেকে আপনারা যারা আছেন সাদা দলের বিশেষ করে আমাদের মনা যারা তারা এটাকে একটু অর্গানাইজ করে এদেরকে একটু সাপোর্ট দিলে হয় না।
ড. মামুন আহমেদ : আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে সাপোর্টটা দেওয়া প্রয়োজন।
তারেক রহমান : প্রয়োজন?
ড. মামুন আহমেদ : হ্যাঁ প্রয়োজন। অর্গানাইজ ওয়েতেই সেটা করা প্রয়োজন। তবে অর্গানাইজ করাটা বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয় নাই। তবে এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে আসলে অর্গানাইজ করার সময় হয়ে এসেছে। আমি শিওর যে আপনি বলাতে এটা আরো বেশি এক্সপাডাইট হবে নিশ্চয়। নিশ্চয় আমরা সেটা করব।
তারেক রহমান : তাহলে আপনাদেরকে তো দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে তো এই জিনিসটা করতে হবে। তো আপনি একটু এগিয়ে আসেন তাহলে। আপনি একটু কথা বলেন সবার সাথে তাহলে। যারা এখানে আছেন তাদের সবার সঙ্গে কথা বলে জিনিসটাকে একটু অর্গানাইজ করেন। আমি আর দুই-একজনকে বলছি। আমি আর দুই-একজনের সাথে কথা বলছি। আপনি একটু আপনার অবস্থান থেকে একটা ভূমিকা রাখেন। একটা ভূমিকা নেন আপনারা।
ড. মামুন আহমেদ : ডেফিনিটলি।
তারেক রহমান : এই নম্বরটা সেইভ করে রাখেন। আপনি আপডেটটা তাহলে এই নম্বরে দিতে পারবেন। এটা আমার নম্বর। অন্য কোনো বিষয়ে প্রয়োজন হলেও আমার সাথে আলাপ করতে পারবেন।
ড. মামুন আহমেদ : আমি তো বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। আর আমি শিক্ষক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। আপনি বোধহয় জানেন। দোয়া করবেন আমাদের জন্য। বিভিন্ন প্রয়োজনে আমি যোগাযোগ করব আপনার সাথে।
তারেক রহমান : আপনিও দোয়া করবেন। তো আই এম এক্সপেকটিং অ্যা আপডেট ফরম ইউ টুমরো।
ড. মামুন আহমেদ : ওকে জি অবশ্যই
তারেক রহমান : আগামীকাল একটা আপডেট আমি আশা করছি।
ড. মামুন আহমেদ : ওকে ওকে জি। আসসালামু আলাইকুম
তারেক রহমান : আসসালামু আলাইকুম

আন্দোলনের নেতৃত্বে কারা?
সরকারি চাকরিতে কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু থেকে যারা সংগঠিত করেছেন, তাদের একজন নুরুল হক। তিনি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক। গত ১৭ই ফেব্রæয়ারী হতে এই সংগঠনের ব্যানারেই চলছে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন। যারা এই আন্দোলনের মূল সংগঠক, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী?
নুরুল হক জানালেন, তাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা আছেন, কিন্তু আন্দোলনটি সম্পূর্ণই অরাজনৈতিক। আমি আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, এখন কোন দলের সঙ্গে নেই। অন্য অনেকে হয়তো কোন দলের সঙ্গে থাকতে পারেন। কিন্তু আমাদের আন্দোলন একেবারেই অরাজনৈতিক। এর পেছনে কোন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নেই। যদি থাকতো আমরা অনেক আগেই সহিংসতার পথ বেছে নিতে পারতাম। কিন্তু আমরা শুরু থেকে একেবারে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন করেছি।


নুরুল হক বললেন, যারা এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র খুঁজছেন, তারা আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। কিন্তু তাদের আন্দোলন যদি এতটাই অরাজনৈতিক হবে, তাহলে মিছিলে কেন তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বহন করছেন?
তবে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের এক ছাত্রী তাসনীম জাহান বললেন, শুরু থেকেই তাদের একটা সচেতন চেষ্টা ছিল এই আন্দোলনকে যেন কোনভাবেই সরকার বিরোধী বলে চিহ্ণিত করা না যায়। সেই চিন্তা এর পেছনে কাজ করেছে।
কিন্তু আন্দোলনকারীরা যত চেষ্টাই করুন, তারা কি সরকারকে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন যে এই আন্দোলন আসলে সরকারের বিরুদ্ধে নয় বা এর পেছনে কোন রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি নেই? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন সোমবার বিকেলে ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দেন, তাতে স্পষ্ট যে, তারা এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন।
তিনি লিখেন, আন্দোলন করতে যারা এসেছে অধিকাংশের হাতেই দেখলাম বঙ্গবন্ধুর ছবি। সাধারণত আন্দোলন সংগ্রাম শ্লোগানে বঙ্গবন্ধুর হরেক রকমের ছবি নেতা কর্মীরা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় এইখানে সবগুলো ছবি একই রকম অর্থাৎ একই ছবি। রাজশাহী , ময়মনসিংহ, ঢাকা সবখানে সরকারি অফিসে ব্যবহৃত ছবিগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ছবিগুলোর সরবরাহকারী গোষ্ঠী একটাই।
আওয়ামী লীগের একেবারে উচ্চ পর্যায় থেকে ছাত্রলীগের নেতারাও এই আন্দোলনের পেছনে এখন একই ধরণের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। ‘জামায়াত-শিবির’ এর পেছনে রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন
কিন্তু আন্দোলনের নেতা নুরুল হক কিংবা সংগঠক তাসনীম জাহান সরকার বা তাদের সমর্থকদের এরকম বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
তাসনীম জাহানের ভাষায়, “মতিয়া চৌধুরির মতো একজন নেত্রী এই কথা বলে আসলে নিজেকেই ছোট করলেন। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, আর উনি আমাকে রাজাকার বলে দিলেন, এটা তো ঠিক হলো না। একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা এটা আশা করি না।
নুরুল হক বললেন, তাদের আন্দোলনে অনেক দলের নেতা-কর্মীরাই আছেন। কিন্তু তারা সচেতনভাবে একটি চেষ্টাই করেছেন, যাতে কোনভাবেই জামায়াত-শিবিরের কেউ এই আন্দোলনে থাকতে না পারে। একই সঙ্গে বামপন্থীরাও যাতে এত যোগ দিতে না পারে। এই দুটি গোষ্ঠীকে আমরা এড়িয়ে চলতে চেয়েছি।
নুরুল হক অভিযোগ করছেন, কিছু বামপন্থী আসলে এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে চাইছে। তারা এর সুযোগ নিতে চাইছে।
তবে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলছেন, এই আন্দোলনে তারা নৈতিক সমর্থন দিলেও এটিকে তারা সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে দেখেন। তারা সচেতনভাবেই এই আন্দোলনের মঞ্চ থেকে দূরে থাকছেন।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তারা অবশ্য দাবি করে যাচ্ছেন যে তাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বললেন, “সরকার, বিরোধী দল অনেকেই আমাদের কাছে এসেছে, যারা এটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা বলতে চাই, আমরা ছাত্ররা একটা দাবিতে রাস্তায় নেমেছি, এটা কোনভাবেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হতে পারে না। গুটিকয় হয়তো এর মধ্যে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা সেটা দেখছি।
মতিয়া চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা দাহ
নতুন করে আন্দোলন জোরদার হওয়ার পেছনে ছিল কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর সংসদে দেয়া বক্তব্য। এ কারণে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভও ওই বক্তব্য ঘিরে। সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের মিছিলের সামনে ছিল মতিয়া চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা। গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে ওই কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর সময় শির্ক্ষার্থীদের জুতাও ছুড়তে দেখা যায়।
কোটা আন্দোলনের পালে ‘বাতাস’ দিতে চাইছিলেন তারেক: হাছান মাহমুদ
এদিকে তারেক রহমান কোটা সংস্কার আন্দোলন অন্য খাতে প্রবাহিত করতে চাইছিলেন বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ। লন্ডনে থাকা তারেকের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন আহমেদের টেলি আলোচনার ভিত্তিতে এই দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নেতারা শুরু থেকে সন্দেহ করে আসছিলেন, কোটা সংস্কারের আন্দোলনের অন্য মতলব রয়েছে। এর মধ্যে বুধবার তারেকের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক নেতা অধ্যাপক মামুনের কথোপকথনের একটি অডিও ইউটিউবে আসে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার সেগুন বাগিচার স্বাধীনতা হলে এক আলোচনা সভায় হাছান মাহমুদ সেই প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত পেট্রোল বোমাবাহিনী বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করছিল।তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মামুনের সাথে কথা বলে আন্দোলনে বাতাস কীভাবে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করেছেন। মামুন সাহেবকে গ্রেপ্তার করা উচিৎ, তাহলে কারা এই ভাংচুর করেছে, তার তথ্য বেরিয়ে আসবে।’
তারেক রহমানের সঙ্গে জাসাস সভাপতি অধ্যাপক মামুনের টেলি আলাপের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বৃহস্পতিবার এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যদি দল সমর্থক কোনো শিক্ষককে আন্দোলনে সমর্থন দিতে বলেন, তাতে অন্যায় কিছু নেই।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেলে কোটা নিয়ে প্রজ্ঞাপন
কোটা পদ্ধতির সংস্কারে কীভাবে কাজ এগোবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়টির জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলো শুনেছি। তিনি কোটা পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করেছেন। আবার তিনি প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্বার্থ যাতে সংরক্ষিত হয়, সে বিষয়ে পৃথক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। আমি এখন অপেক্ষায় আছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে যেভাবে অগ্রসর হতে বলবেন, সেভাবেই বাকি কাজ করব।
সব কোটা বাতিল হবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক খান বলেন, যখন প্রজ্ঞাপন জারি করব, তখন আরো বিশ্লেষণ করে সেগুলো স্পষ্ট করব। সরকারপ্রধানের কাছ থেকে সুস্পষ্ট পরামর্শ, নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নেব। প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
প্রজ্ঞাপন কবে হতে পারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, এটা খুব জরুরি না এখন। কারণ এখন তো নিয়োগ হয়ে যাচ্ছে না। কাজেই আমরা যদি একটু সময় নিই, তাহলে দেশের কোনো ক্ষতি হবে না।
শুধু বিসিএস চাকরি, নাকি সব কোটা বাতিল হচ্ছে?Í এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, সব ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে। তবে আরো ছোট ছোট দপ্তর, টেকনিক্যাল অনেক পদ আছে, সেগুলোর সঙ্গে মেলানো ঠিক হবে না। এগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
পাঁচ দফা শর্ত আন্দোলন স্থগিত
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির আগ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। টানা চারদিন আন্দোলনের পর বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হলেও কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়ায় অনেকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আন্দোলনকারীরা একদিন সময় নিয়ে আন্দোলন স্থগিতের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর ব্যানারে চলা আন্দোলনে বুধবার উত্তাল ছিল সারা দেশ। বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করায় স্থবির হয়ে পড়েছিল রাজধানী। এমন পরিস্থিতিতে বিকালে সংসদে দেয়া দীর্ঘ বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতিই বাতিলের ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ওয়েবসাইট হ্যাক করে কোটা বিরোধী শ্লোগান
এদিকে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের সরকারি কয়েকটি ওয়েবসাইট হ্যাক করে সেখানে কোটা বিরোধী শ্লোগান ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করে সেখানে কোটা বিরোধী শ্লোগান ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১১টার পর এসব ওয়েবসাইট হ্যাকড হয়। তবে কারা এসব হ্যাকিং করেছে, তা জানা যায়নি। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গভবনের ওয়েবসাইট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট, জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট, বিসিএস প্রশাসনের ওয়েবসাইট, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট । এসময় এসব ওয়েবসাইটে দেখা যায়, কালো স্ত্রীনের মাঝে কোটা বিরোধী আন্দোলন চলার সহিংসতার একটি ছবি, যেখানে একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বড় করে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘হ্যাকড বাই বাংলাদেশ’। ছবির নীচে হ্যাশট্যাগের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘রিফর্ম কোটা বিডি’, ‘রিফর্ম কোটা সিস্টেম’, ‘স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ ইত্যাদি।
উচ্চ আদালতে গড়াতে পারে কোটার ভাবিষ্যত
এদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তা উচ্চ আদালতে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পৃথকভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীও রিট আবেদন করবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোটা পদ্ধতি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত সংবিধানে বিদ্যমান প্রতিশ্রæতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আদালতে গেলে কোটা পদ্ধতি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত টিকবে না। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক হয়, এমন কিছু উচ্চ আদালত গ্রহণ করেন না।
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে সুযোগের সমতা অংশের ১৯-এর (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ একইভাবে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা অংশের ২৯-এর (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সমতা থাকিবে।’ অনুচ্ছেদ (২)-এ বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’
অনুচ্ছেদ (৩)-এ ‘এই অনুচ্ছেদের কোন কিছু (ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা হইতে, (খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মালম্বী বা উপ-সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধানসংবলিত যে কোন আইন কার্যকরা করা হইতে, (গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে, রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিসিএসে মেধাতালিকা থেকে ৪৫ শতাংশ নিয়োগ হয়। বাকি ৫৫ শতাংশ আসে কোটা থেকে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য (ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি) ৩০, মহিলা ১০, জেলা ১০ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (উপজাতি) ৫। এ ছাড়া এসব কোটা পূরণ না হলে সেখানে ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য। আর যদি সংশ্লিষ্ট চাকরির ক্ষেত্রে এসব প্রাধিকার কোটা পূরণ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে মেধাতালিকা থেকে প্রতিবন্ধীর কোটা পূরণ করা হয়। নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একই কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ঘোষণা প্রজ্ঞাপন আকারে জারির দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ওই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া পর্যন্ত নিজেদের আন্দোলন স্থগিত করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা এ অবস্থান জানান।
টানা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার কোটা পদ্ধতিই বাতিল করার ঘোষণা দেওয়ার পর নিজেদের অবস্থান জানাতে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সময় নেন শিক্ষার্থীরা। এরপর এ সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে এ নিয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ আকারে প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এসময় আন্দোলন চলাকালে যেসব সাধারণ শিক্ষার্থকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মুক্তিসহ আহতদের চিকিৎসার দায়ভারও সরকারকে বহন করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা প্রজ্ঞাপন আকারে জারির দাবি জানাচ্ছি আমরা। আর সে প্রজ্ঞাপনটি জারি হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here