লোকরঞ্জনবাদ, তোষণের রাজনীতি ও বিশ্বায়ন 

0
180

 

ড. আনিস চৌধুরী

বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমÐিত রাজনৈতিক উন্নয়ন হলো লোকরঞ্জনবাদ এবং পরিচিতির (আইডেন্টিটি) রাজনীতির উত্থান। পরিচিতির রাজনীতির অংশ হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানও দেখা গেছে এবং লোকরঞ্জনবাদ চরম দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে উত্তেজিত করে চলেছে।

আশির দশকের প্রথম দিক থেকে একটি সমান্তরাল উন্নয়ন শুরু হয়, সেটি হলো বিশ্বায়নের দ্রæত বিস্তার। বর্তমান ধাপের বিশ্বায়নকে আগের বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে পৃথক করে কেবল তার গতি নয়, বরং প্রকৃত ব্যাপার হলো, এটি করপোরেট স্বার্থে পরিচালিত; যেটিকে কেউ কেউ বলেছেন, ‘আধিপত্যের অধীনে বিশ্বায়ন’ (গেøাবালাইজেশন আন্ডার হেজিমনি)।

অনেকের জিজ্ঞাস্য, এ দুই উন্নয়নের [বৃহৎ বহুজাতিক করপোরেশনের (এমএনসি) অধীনে বিশ্বায়ন এবং লোকরঞ্জনবাদ ও পরিচিতির রাজনীতির উত্থান] মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কিনা। কয়েকটি অনুঘটক এ দুয়ের মধ্যে একটি কারণিক সংযোগ প্রতিষ্ঠা করে। এগুলোকে চারটি শিরোনামে ব্যাখ্যা করা যেতে পারেÍ বিচ্ছিন্নতা বা বৈরীভাব, অসমতা বা বৈষম্য বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের দুর্বল হওয়া এবং সমাজ গণতন্ত্রীদের (সোস্যাল ডেমোক্র্যাটস) ব্যর্থতা।

বিচ্ছিন্নতা বা বৈরীভাব

বিশ্বায়নের গতি ও বিস্তার মানুষকে একটি নতুন জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পর্যাপ্ত সময় দেয়নি। একটি বৈশ্বিক ভোক্তা শ্রেণীর জন্য পণ্য স্ট্যান্ডার্ডাইজের সুবিধার্থে বৈশ্বিক মূল্যবোধ ব্যবস্থা সৃষ্টিতে স্থানীয় মূল্যবোধকে ধূলিসাৎ, স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রান্তিক, সামাজিক রীতি-প্রথাকে অবমূল্যায়ন এবং স্থানীয় ধরন ও রুচিকে নির্বাসিত করার এমএনসির একটি নিরন্তর তাড়না রয়েছে। এটা বাজার সম্প্রসারণ ও বর্ধিত প্রতিযোগিতার কারণে তাদের ব্যয় কমাতে প্রয়োজন।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দ্বারা ব্যয় কমানো এবং পণ্যের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন সহজ হয়। বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ভাগ করে ফেলেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এটিকে বলা হয় বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল (জিভিসি)। এসব করপোরেশনকে করছাড়, পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সস্তা শ্রমশক্তি (যারা বেশি মজুরি, ভালো কর্মপরিবেশ কিংবা চাকরি নিরাপত্তা আশা করতে পারে না) জোগান দেয়ার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন রুটির ভাগ পেতে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো হলো এক্ষেত্রে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত (নিট লুজার)। কারণ জিভিসি থেকে প্রাপ্ত রুটির ভাগ রাজস্ব ছাড় দ্বারা পোষানো যায় না। অর্থাৎ এমএনসি থেকে প্রাপ্ত ভাগ রাজস্ব ছাড় দেয়ার সুবিধার চেয়ে কম। আবার পরিবেশগত ও শ্রমমানের দিক থেকে নিচে যাওয়ার ইঁদুর দৌঁড় উন্নয়নশীল জাতিগুলোর সার্বিক কল্যাণে অধিকতর অবনমন ঘটাচ্ছে।

বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যয় কমানোর মাধ্যমে এমএনসিগুলো মুনাফার পড়তি হার প্রতিরোধ করতে পারে, যেমনটি পূর্বানুমান করেছিলেন মার্ক্স। বৃহৎ বহুজাতিক করপোরেশনগুলো মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা (সুপার প্রফিট) করায় পুঁজিবাদী বিশ্বের উন্নত দেশসহ প্রায় প্রতিটি দেশের জাতীয় আয়ে মজুরির অংশ কমেছে, যেহেতু এমএনসিগুলো তাদের স্ট্যান্ডার্ডাইজড পণ্য অফশোরে (বিদেশে) উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। স্থায়ী পূর্ণকালীন চাকরির স্থলে পার্টটাইম অনিরাপদ নৈমিত্তিক কর্মী প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে এবং শ্রম ইউনিয়ন বা সংগঠনগুলোর ক্ষমতা বিলোপের সুবাদে কাজ ও মজুরি শর্ত কাটছাঁট করা হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে মার্গারেট থ্যাচার কর্তৃক যুক্তরাজ্যে শক্তিশালী কয়লা শ্রমিক সংঘকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং রিগ্যান কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রে গণহারে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের চাকরিচ্যুতির মাধ্যমে আশির দশকের প্রথম দিকে বিদ্যমান এমএনসি পরিচালিত বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। নতুন ধরনের সপ্তাহের প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা কাজে অভ্যস্ত করতে শ্রমবাজার অধিক নমনীয় করার নামে শ্রমিকদের ওপর নানা উৎপীড়ন চলতে থাকে। উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর শ্রমিকদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা উন্নত দেশের শ্রমিকদের মজুরি কমানো ও চাকরি অনিরাপত্তা বাড়িয়ে তোলে। এ সম্ভাবনা দেখিয়ে দেশগুলোর শ্রমিককে জিম্মি করে ফেলা হয়Í বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় সস্তা শ্রম খোঁজার উদ্দেশ্যে এখানে ব্যবসা বন্ধ হবে এবং অন্যত্র চলে যাবে, আবার নতুন দেশে কর ছাড় ও অন্য সুবিধা পাওয়া যাবে; কাজেই তাদের মজুরি ও অন্য সুযোগ-সুবিধা কমাতে হবে। ফলে উচ্চ নির্বাহীদের বেতন ও তাদের গড় কর্মীদের মজুরির মধ্যকার ব্যবধান বিশ্বজুড়ে দ্রæতগতিতে বেড়ে চলেছে।

অসমতা বা বৈষম্য বৃদ্ধি

এসব উন্নয়নের অন্যতম পরিণাম হলো, বিস্ময়করভাবে অসমতা বৃদ্ধি। অক্সফামের গবেষণামতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পদের চেয়ে সর্বোচ্চ ধনী ১ শতাংশের সম্পদ বেশি। বর্তমানে বৈশ্বিক সম্পদবৈষম্য অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। অবশ্য এটি জানা অসম্ভব, ধনীরা সত্যিই কর অবকাশকেন্দ্র ও সিক্রেসি জুরিসডিকশনের স্থানে কতটা সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, কর অবকাশকেন্দ্রে ৩২ ট্রিলিয়নের বেশি সম্পদ রাখা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। আমরা এটিকে বিবেচনায় নিলে সম্পদবৈষম্যের পরিস্থিতি আরো অনেক খারাপ মনে হবে।

ওইসিডির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অনেক দেশে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আশির দশক থেকে বিশ্বে যে আয়বৈষম্য বেড়েছে, তা গত ২০০ বছরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়ের একটি। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর বেলায় দেখা গেছে, সেখানে গত অর্ধশতকে আয়বৈষম্য সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। ওইসিডিতে দরিদ্র ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধনী ১০ শতাংশের গড় আয় প্রায় নয় গুণ বেশি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে স্থিতিশীল থাকার পর আশির দশক থেকে জাতীয় আয়ে শ্রমিকদের মজুরির অংশ কমে আসছে (নিচে পরিসংখ্যান ও ছক দেখুন)। সংস্থাটির মতে, এ প্রবণতা প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক একীভূতকরণে ব্যাপক অগ্রগতি দ্বারা চালিত হয়।

বাংলাদেশ এবং ভারতও ব্যতিক্রম নয়। ফ্রান্সের অর্থনীতিবিদ লুকাস চ্যাঞ্চেল ও তমাস পিকেটি দেখিয়েছেন, গত ৩০ বছরের মধ্যে ১ শতাংশের আয় অংশের কেন্দ্রীকরণে ভারতে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ঘটেছে। জাতীয় আয়ে দেশটিতে এখন ১ শতাংশ ধনীদের অংশ ২২ শতাংশে পৌঁছেছে, আশির দশকের প্রথম দিকে যেখানে এটি ছিল ৬ শতাংশ। নতুন বিশ্ব ধন (সম্পদ) তথ্য থেকে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ভারত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসম দেশ, যেখানে মোট সম্পদের ৫৪ শতাংশই মিলিয়নেয়ারের নিয়ন্ত্রণে। ৫ হাজার ৬০০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ মোট ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে দেশটি বিশ্বের ১০ ধনী রাষ্ট্রের একটি; যদিও সেখানে গড়ে ভারতীয়রা আপেক্ষিকভাবে বেশ দরিদ্র। সর্বসাম্প্রতিক ক্রেডিট সুইজ তথ্যেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে, ধনী ১ শতাংশ লোক দেশটির মোট সম্পদের ৫৩ শতাংশের মালিক, ২০০০ সালে যা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে পিরামিডের শেষ প্রান্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেই কেবল ৪ দশমিক ১ শতাংশ সম্পদের জন্য ধাক্কাধাক্কি করে। ভারত সত্যিই দীপ্তি ছড়িয়ে আসছে মধ্য ৪০ শতাংশের জন্য নয়; উপরের দিকের ১০ শতাংশ বিত্তবানদের জন্য।

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতে, বাংলাদেশ এশিয়ার ১৫টি দেশের একটি, যেখানে গত তিন দশকে অসমতা বা সম্পদবৈষম্য লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। আবার ২০১১ সালের উন্নয়ন অন্বেষণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অসমতা নির্ণয়ের সাধারণ পরিমাপক জিনি সহগ (জিনি কোইফিসিয়েন্ট) ২০১০ সালে শূন্য দশমিক ৪৫৮-এ (শূন্য দশমিক ৪৫৮) উন্নীত হয়েছে; যেটি ক্রিটিক্যাল ভ্যালু ৪-এর উপরে রয়েছে এবং ১৯৭৩-৭৪ সালে এটি ছিল শূন্য দশমিক ৩৬ (শূন্য দশমিক ৩৬)। বিশ্বব্যাংকের মতে, জাতীয় আয়ে নিচের ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর (সবচেয়ে দরিদ্ররা) অংশ ১৯৮৪ থেকে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে নেমে এসেছে; অন্যদিকে একই সময়ে উপরের ১০ শতাংশের (ধনীদের) আয়ের অংশ ২১ দশমিক ৮৭ থেকে ২৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

রাষ্ট্রের দুর্বল হওয়া

দুর্ভাগ্যবশত রাষ্ট্র ক্রমেই নানা ধরনের ঝুঁকি-হামলার মুখে থাকা বা দুর্বল হওয়ায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, চাকরি হারানো মানুষ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা বা নিজেদের প্রয়োজনীয় নিত্য চাহিদা মেটাতে রীতিমতো সঙ্গিন মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা জোগানোর দিক থেকে সরকারগুলোর সামর্থ্য সাংঘাতিক মাত্রায় সীমাবদ্ধ হয়েছে। রোনাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচার উভয়ই মনে করতেনÍ রাষ্ট্র কিংবা সরকার সমাধানের নয়, সমস্যার উৎস। কাজেই এ দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি বাদ দেয়া বা কাটছাঁট করা হয়।

বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো রাজস্ব আহরণ বাড়াতে চেষ্টা করলেও তারা ব্যবসায়ী ও ধনীদের কর রেয়াত দিতে বাধ্য হয়; যদিও তারা হিসাব কারসাজি এবং কর অবকাশকেন্দ্রগুলোর দেয়া সুবিধা ব্যবহার করে কর ফাঁকির দেয়ায় কুখ্যাত। ২০১৬ সালে আইএমএফের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈশ্বিকভাবে এমএনসিগুলো কর্তৃক মুনাফা স্থানান্তর দ্বারা কোনো কোনো দেশের সরকার বছরে আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারায়। ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক দেখিয়েছে, এটি সর্বনিম্ন তথ্য; তবে নিম্নআয়ের দেশগুলোর জিডিপি এবং আইএমএফের প্রতিবেদনে দেখানো মোট কর রাজস্বের অনুপাত হিসেবে বৈশ্বিক রাজস্ব হারানো আরো বেশি।

সমাজ গণতন্ত্রীদের (সোস্যাল ডেমোক্র্যাটস) ব্যর্থতা

দুর্ভাগ্যক্রমে সমাজ গণতান্ত্রিক বা বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক রাষ্ট্র ও সংঘের (ইউনিয়ন) ওপর করা হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। টনি বেøয়ার কিংবা বিল ক্লিনটিনের তথাকথিত তৃতীয় পন্থা করপোরেট স্বার্থের কাছে সার্বিক সমর্পণ ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা নির্বাচনে জিতেছিল রক্ষণশীল কর্মসূচির বাস্তব বিকল্প অথবা এমএনসির ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে নয়, বরং জিতেছে প্রাইভেটাইজেশন, বিনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক কর্মসূচি ছাঁটাই ও বিশ্বায়নের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রæতির মাধ্যমে। এদিক থেকে তারা পোপের চেয়েও সত্যিকার বিশ্বাসীতে পরিণত হয়েছে!

অবিশ্বাস্য হলো, ভারতে উদারীকরণ ও প্রাইভেটাইজেশনের আর্থসামাজিক কর্মসূচি প্রবর্তন করে কংগ্রেস। সাধারণ মানুষ বিজেপির ‘সাইনিং ইন্ডিয়ার’ ¯েøাগান পরিহার করায় অপ্রত্যাশিতভাবে ২০০৪ সালের নির্বাচনে দলটি ছিটকে পড়ে। অবশ্য সবার জন্য হতাশার বিষয় হলো, কংগ্রেস বিজেপিকে অভিজাত ও এমএনসির বন্ধু হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে নির্বাচনে হারালেও কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিং আইএমএফ নির্দেশিত কাঠামোগত সংস্কার ও উদারীকরণ নীতিগুলো বাস্তবায়ন করেন। করপোরেট স্বার্থে অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করা অব্যাহত রাখায় দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বর্ধিষ্ণু অসমতা ভালোভাবে দেখেছেন। কাজেই বিস্ময়ের এমন কী আছে যে, ভোটাররা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হলো?

সার কথা হলো, বর্তমান ধাপের বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা বাড়িয়েছে এবং সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করেছে। মার্গারেট থ্যাচারের বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করুনÍ ‘সমাজ বলে কোনো জিনিস নেই। আছে শুধু ব্যক্তি পুরুষ ও নারী… এবং নিজেদের নিজেদেরকেই দেখভাল করতে হবে।’ সমাজ গণতন্ত্রীদের ব্যর্থতা দ্বারা সৃষ্ট শূন্যস্থান, দুস্থ, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সামর্থ্য দুর্বল হওয়া, করপোরেশন কর্তৃক নিরন্তর মুনাফা খোঁজার প্রচেষ্টা সৃষ্ট হুমকি পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে; যেখানে লোভকে দেখা হয় ভালো হিসেবে। এ পরিস্থিতিতে মানুষ শিকড়ে ফিরে যেতে, ‘পুরনো’ মূল্যবোধ আঁকড়ে থাকতে এবং যাদের সঙ্গে তাদের পরিচয়ের মিল পায়, তাদের কাছে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে। এটি মৌলবাদের উত্থান ও জাতীয়তাবাদ, জাতি ও ধর্মভিত্তিক চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উর্বর ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এবং হিটলার কিংবা মুসোলিনির (উভয়ই জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন) উত্থানের মধ্যে সমান্তরাল দেখা খুব একটা কঠিন নয়।

লেখক: অ্যাডজাংকট প্রফেসর, ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড দি ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here