নির্বাচন নিয়ে সংশয়, জাতিসংঘের নজরে বাংলাদেশ 

0
222

দুদকের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন \ দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের বিচার দাবী
নাসিরা আফরোজ রোজী: কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছাড়া দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাকে বৈশ্বিক অবস্থানে ‘বি’ ক্যাটাগরির বলেও মন্তব্য করেছে বিশ্ব সংস্থাটি। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশের দেয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে এসব সুপারিশ ও মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটি। গত ১৫ ও ১৬ মার্চ কমিটির সপ্তম, অষ্টম ও নবম বৈঠকে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ২৮তম বৈঠকে প্রতিবেদনের ওপর এ পর্যবেক্ষণ দেয় জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার কমিটি।
কমিটির পর্যবেক্ষণে দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক কমিটি বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রবণতা ও তার ব্যাপ্তি এবং এর চরম প্রভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ। এতে দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশকে চারটি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। এগুলো হলো, সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। দুর্নীতি দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের বিচারের আওতায় আনা। সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুদককে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। আর সবশেষে দুর্নীতির ফলে এর প্রভাব এবং ক্ষতি নিয়ে সাধারণ জনগণ ও সরকারের কর্মকর্তাদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো।
জাতিসংঘ কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গেøাবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাকে ‘বি’ ক্যাটাগরির সংস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘ কমিটিও মনে করে, বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। বিশেষ করে লোকবল ও অর্থায়নের জন্য সরকারের ওপর কমিশনের নির্ভরশীলতা উদ্বেগের বিষয়। কমিশনের কাজের সীমিত পরিসরের কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্থাপন হচ্ছে না। এ কারণে কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ কমিটি। এর সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ ঢেলে সাজিয়ে কমিশনের কাজের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছে জাতিসংঘ।
বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, শ্রম অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী, সুশীল সমাজ ও ভিন্নমত প্রদানকারীদের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ কমিটি। বিশেষ করে সংশোধিত আইসিটি আইন-২০১৩, খসড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন-২০১৮, ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন আইন-২০১৬ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে মানবাধিকার কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। আর আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, খসড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন-২০১৮ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর বিতকি
তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে জাতিসংঘ কমিটি। জাতিসংঘ কমিটি বলেছে, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্তে¡ও ১০ লাখের ওপর রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তা কমিটি অনুধাবন করছে। তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অঙ্গীকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। কমিটি রোহিঙ্গাদের আইনগত মর্যাদা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ বাংলাদেশ এখনো এসব শরণার্থীকে আইনগত মর্যাদা দেয়নি। ফলে তাদের চলাফেরা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মৌলিক সেবাগুলো নিশ্চিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের আইনগত মর্যাদা দেয়ার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। এছাড়া আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের যে ঝুঁকি রয়েছে, তা মোকাবেলায় মানবিক সাহায্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে অনতিবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
নির্বাচন নিয়ে সংশয়
এদিকে বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে, আল জাজিরা। জাতিসংঘের রিপের্টেও পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাবাস রাষ্ট্রের হাতে। ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের ফলে দেশটির আগামী নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরবর্তী নির্বাচন হবে সহিংস উপহাস মাত্র। ২০১৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচন প্রায় সব ক’টি বিরোধী দলই বর্জন করেছিল। ব্যাপক আকারে সহিংসতা ও হত্যাকাÐের ফলে ওই নির্বাচন হয়েছে বিতর্কিত। এবারও তারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বিরাজ করছে বাংলাদেশে। খবরে বলা হয়, সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা কারাবন্দি বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কায় দিনতিপাত করছে। সাধারণ মানুষের মনেও নির্বাচনী বছর নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। এ বছরের ডিসেম্বরে সংসদীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশে।
প্রধান বিরোধী নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত মাস থেকে বন্দি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে এখন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা ক্রমেই দুরূহ ঠেকছে যে, সরকার ক্রমেই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে।
৮ই ফেব্রæয়ারি নিজের স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি দাতব্য সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদÐ দেয়া হয়। তার বড় ছেলে ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক রহমান ও আরও চার জনকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। প্রায় এক মাস পর খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হয়। তবে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ওই জামিন স্থগিত করেন। ফলে অন্তত আগামী ৮ই মে পর্যন্ত ৭২ বছর বয়সী খালেদা জিয়া কারাগারে থাকছেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গ্রেপ্তার ও বন্দিত্ব বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা সৃষ্টি করেছে। বিএনপি অভিযোগ করছে, খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে রাখতে সরকারি চক্রান্তের অংশ হিসেবে তাকে জেলে ঢুকানো হয়েছে।
বিএনপি অভিযোগ করছে, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে দলটির প্রায় ৫ শতাধিক সমর্থককে হত্যা ও প্রায় ৭৫০ জনকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে। দলটি দাবি করে, নিখোঁজ নেতাকর্মীদের মধ্যে কমপক্ষে ১৫০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে অথবা গুম করা হয়েছে।
সম্প্রতি জার্মান থিংক ট্যাংক বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে; যাতে বলা হয়, দেশটি এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনাধীন। ১৩টি দেশকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডায় গণতন্ত্র কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অবনমনের মধ্যদিয়ে গেছে। ফলে এই ৫টি দেশ এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদÐ রক্ষা করতে পারছে না।
বাংলাদেশের ভেতরের ও বাইরের পর্যবেক্ষকরা বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশনের ওই কড়া প্রতিবেদনের সঙ্গে মোটামুটি সহমত পোষণ করেছেন। ১০ বছরের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনমন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার হয়েছে প্রায় ৫১৯ জন। এছাড়া ৩০০ জন এখনও নিখোঁজ।
কাতার ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা উঠিয়ে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘সরকার বিরোধী পোস্ট’ দেওয়ার অভিযোগ উঠানো হয়। তার মেয়ে শাবনম জামান বলেন, ‘৪ঠা ডিসেম্বর থেকে আমার পিতা নিখোঁজ।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ যখন আমার পিতার অন্তর্ধান হওয়ার সম্যক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়েছে, তখন থেকেই তারা তদন্ত থামিয়ে দিয়েছে।’ এ বছরের মার্চে বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের এক নেতা জাকির হোসেন হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাকে নির্যাতন করেছে পুলিশ। গত বছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডবিøউ) বলেছে, সরকার গোপনে শ’ শ’ মানুষকে আটক করেছে। এদের বেশির ভাগই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিকভাবে সাড়া প্রদানের ফলে বাংলাদেশ হয়তো আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে। তবে দেশটির ঘরোয়া মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘সরকার এখনও গুমের বিষয়টি অস্বীকার করে চলেছে। সরকারকে অবশ্যই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটককৃত ব্যক্তিবিশেষকে মুক্তি দিতে হবে। গুম হওয়া অনেকেই রাজনৈতিক বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ মিনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা এক ভয়ের পরিবেশে কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে অনুকূল নয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তো দূরের কথা। আলী রীয়াজ মনে করেন, চাপের মুখে থাকা বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনও বয়কট করতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই নির্বাচনেরও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো কোনো নৈতিক বৈধতা থাকবে না। তার ভাষ্য, ‘বিরোধী পক্ষকে অব্যাহতভাবে নির্যাতন করা শুধু অবিচক্ষণ সিদ্ধান্তই নয়, এটি হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। বাংলাদেশের শাসক দলগুলোর মধ্যে তা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকে।’
হাসিনা-খালেদা: দুজনের জন্য দুই আইন
দেশে আইনের শাসন নেই বলে দাবি করছেন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, আইনবিদ, বিশিষ্টজন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় দায়েরকৃত একটি মামলায় খালেদা চিয়াকে কারাজাওে আন্তরিণ করা হয়। অথচ প্রধানমন্ত্র শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একই সরকারের দায়েরকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহার কওে নেওয়া হয়েছে যা পক্ষপাতদূষ্ট আচরণ বলে মনে করা হচ্ছে। আইনের ক্ষেত্রে একই অবস্থা সরকারী দলের অন্যান্য রাজনীতিবিদ এবং বিরোধীদলের নেতাদেও ক্ষেত্রে। সেই সাথে সরকারী আমলা ও ব্যংক কর্মকর্তাদেও বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও আইন তাদেও নাগাল পাচ্ছে না। এমননি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অংকের অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ার পর এফবিআইএর অভিযোগ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই অর্থ পাচার হয়। কিন্তু হাসিনা সরকার সে অর্থ পাচারের তদন্ত করলেও তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। মনে করা হচ্ছে জাতিসংঘ এই সকল বিষয়গুলো পর্যবেক্ষন করছে।
শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে মোট ১৫টি মামলা ছিলো। তবে কোনো মামলায় তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে অনুগত বিচারপতিদের দিয়ে তিনি সবগুলো মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেন। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৯টি মামলা করে। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারীর পর মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের অনিয়মতান্ত্রিক সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করে আরো ৬টি মামলা। ১৫টি মামলার ৬টি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আর হাইকোর্টের মাধ্যমে বাতিল করিয়ে নেয়া হয় ৯টি মামলা।
২০১০ সালের ৩ মার্চ থেকে শুরু করে ৩০ মে পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই ৯টি দুর্নীতি মামলা বাতিল করে হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চ। সেই সময় এই দুটি বেঞ্চের একটি বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন বিচারপতি মো. শামসুল হুদা ও বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী এবং অপর বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি বোরহান উদ্দিন। এই দুই বেঞ্চের দুই সিনিয়র বিচারপতি ছিলেন শামসুল হুদা ও মানিক।
জানা গেছে, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র পাঁচ মাস আগে ২০০১ সালের ফেব্রæয়ারিতে গোপালগঞ্জের আওয়ামি লীগ নেতা মোহাম্মদ শামসুল হুদা এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর পর রাষ্ট্রপতি তাদের চাকরি স্থায়ী করতে পারেন আবার নাও পারেন। তাদের অস্থায়ী নিয়োগ দু’বছর হলে ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার তাদের স্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করেনি। এরপর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে এই বিচারপতিদের ভাগ্য খুলে যায়। আদালতের একটি রায়ের দোহাই দিয়ে ২০০৯ সালের ২২ মার্চ তারা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে পুনরায় স্থায়ী নিয়োগ পান। ফলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার প্রতিও এই বিচারপতিদের কৃতজ্ঞতার শেষ ছিলোনা।
শেখ হাসিনার আমলে বিচারপতি হিসেবে পুনর্বহাল হওয়া এই দুই বিচারপতির একজন বিচারপতি শামসুল হুদার বেঞ্চে মাত্র তিনমাসে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি মামলা বাতিল করে দেয়া হয়। এই পাঁচটি মামলা হলো, ফ্রিগেট (যুদ্ধজাহাজ) ক্রয় দুর্নীতি মামলা, মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা এবং ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা এবং বেপজায় পরামর্শক নিয়োগের মামলা। ঠিক একই সময়ে হাইকোর্টের অপর বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও মাত্র তিন মাসের মধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির চারটি মামলা বাতিল করে দিয়েছিলেন। এই চারটি মামলা হলো, নভোথিয়েটার দুর্নীতি সংক্রান্ত তিনটি মামলা এবং মিগ যুদ্ধ বিমান ক্রয় দুর্নীতি মামলা।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ
বেপজায় পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি : রাষ্ট্রের ২ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬৮৮ টাকা ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেছিলো। ২০১০ সালের ৩০ মে এই মালাটি বাতিল করে দেয় বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
ফ্রিগেট ক্রয় দুর্নীতি মামলা : দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে দক্ষিন কোরিয়া থেকে পুরাতন যুদ্ধজাহাজ ক্রয় করে রাষ্ট্রের ৪৪৭ কোটি টাকার ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০২ সালের ৭ ই আগষ্ট শেখ হাসিনাসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেছিলো দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ১৮ মে হাইকোর্টে এই মামলাটি বাতিল করে দেন বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা : অবৈধভাবে কাজ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল এই দুর্নীতির মামলাটি খারিজ করে বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
খুলনায় ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলা : বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি টাকা চাঁদা নিয়ে খুলনায় ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতাকে কাজ দেয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলা করে মইন-ফখরুদ্দীন আমলের দুদক। এই চাঁদাবাজি মামলায় ২০০৮ সালের ১৮ মে অভিযোগ গঠনের পর বিশেষ জজ আদালতে মামলার সাক্ষগ্রহণ শুরু হয়েছিলো। ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল এ মামলাটি বাতিল করে দেয় বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
নাইকো দুর্নীতি মামলা : রাষ্ট্রের ১৩ হাজার ৬৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ফখরুদ্দিন সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেছিলো দুদক। ২০১০ সালের ১১ মার্চ এ মামলাটি বাতিল করে দেয় গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় দুর্নীতি মামলা : নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে রাষ্ট্রের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর এ মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। এ মামলায় ২০০৮ সালের ২০ আগষ্ট শেখ হাসিনাসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। এ মামলার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দায়ের করা একটি কোয়াশমেন্ট আবেদন আদালত খারিজ করে দিয়ে বলা হয় এই মামলাটি নিম্ন আদালতে চলতে। প্রধান বিচারপতি এম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির ফুল আপিলেট ডিভিশন এই রায় দেয়। ফলে বিশেষ জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১০ সালের ৯ মার্চ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান ক্রয়ে দুর্নীতি মামলাটি বাতিল করে দেয় যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণ দুর্নীতি মামলা : মাওলানা ভাসানীর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণে প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি, অবৈধভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রের ৫২ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে ২০০২ সালের ২৭ মার্চ তেজগাঁও থানায় তিনটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ৪ মার্চ তিনটি মামলা বাতিল করে দেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের নামে থাকা ১৫টি মামলার মধ্যে নয়টি মামলা এই দুই দলীয় বিচারপতিকে দিয়ে এবং বাকি ছয়টি মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহার করে নেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here