স্বাধীনতার মাস

0
342

ফয়সাল আহমেদ: ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে জাতি এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই আহ্বান। বঙ্গবন্ধু সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, শত্রæর মোকাবিলায় পাড়ায় পাড়ায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলতে। এই মন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে তার নেতৃত্বে একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ ছিল। তারই অনুপ্রেরণায় যুদ্ধের দিনগুলোতে আমরা হাজারো মায়ের কান্না, শিশুর আর্তনাদ ও বোনের হাহাকারের শোধ নিতে শত্রæর মোকাবিলা করেছে বাঙারীরা। অনেকে আজ ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান মেনে নিত তাহলে স্বাধীনতা যুদ্ধ হতো না বা প্রয়োজন ছিল না। ‘৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী সময়ক্ষেপণ ও টালবাহানা না করে গণতান্ত্রিক ধারায় ও রীতিনীতি অনুযায়ী যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করতেন তাহলে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন। তবে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সংগ্রামের দীর্ঘ পথ আরও কিছুটা অতিক্রম করতে হতো। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলার মানুষের অধিকার সংরক্ষিত রেখে পুরো পাকিস্তানের ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উপলব্ধি করলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে সর্বাত্মক বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে এবং অঘোষিতভাবে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় সত্তা বিকশিত হয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ সময়ের অপেক্ষায় থাকবে।
সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের এই অঞ্চলগুলো থেকেও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেখানকার জনগণ প্রতিবাদী হওয়ার জন্য উৎসাহিত হতেন। এতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ ছাড়া অবশিষ্ট পাকিস্তান ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে। এই বাস্তব উপলব্ধিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী/ভুট্টোগংরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত ‘৭০-এর নির্বাচনের পরপরই নিয়েছিলেন। কোনো অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব দেওয়া যাবে না। এই সিদ্ধান্ত আগ থেকে তারা মনে লালন করে আসছিলেন। সেই জন্য তারা গভীর ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা অনুযায়ী আমাদের জাতীয় সত্তা বিকশিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে সর্বক্ষেত্রে পঙ্গু করে তাদের অধীনস্ত একটি কলোনিতে পরিণত করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি প্রায়ই সম্পন্ন করে ফেলেন।
আন্দোলনে উত্তাল মার্চের প্রতিটি দিনই ছিল উত্তপ্ত। বাঙালিরা তাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা লাভের জন্য রাজপথে নেমে আসে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আহŸানে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যায়। মার্চের প্রতিটি দিনই তাই ছিল আন্দোলনমুখর ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছিল সঙ্কট ততই গুরুতর হচ্ছিল। এমনই পরিস্থিতিতে ১৫ মার্চ ঢাকা সফরে আসেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ১৯৭১ সালে উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে সকালে প্রেসিডেন্ট হাউসে (এখন ফরেন সার্ভিস একাডেমী সুগন্ধা) কড়া সামরিক পাহারায় বৈঠকে বসে ইয়াহিয়া-মুজিব। কোন পরামর্শদাতা ছাড়াই সকাল ১১টায় শুরু হয় দু’জনের একান্ত এই বৈঠক। আলোচনা চলা অবস্থায় সংরক্ষিত এলাকার বাইরে অসংখ্য ছাত্র-জনতা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ¯েøাগান দেয়। বাইরে অপেক্ষা করে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা। টানা আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু বলেন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা চলবে। কাল সকালে আবার আমরা বসছি।
ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে তুলে ধরেন শেখ মুজিবুর রহমান। ধানমÐির বাসভবনে অনুষ্ঠিত আলোচনা চলে বিকেল পর্যন্ত। আবার দ্বিতীয় দফা ৮টায় দলীয় নেতাদের সঙ্গে বসে বৈঠক। শেষ হয় গভীর রাতে।
এদিকে মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড শ্রমিকরা শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকা মিছিল করেন। টঙ্গীর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা করে জঙ্গি মিছিল। চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে নগরীতে বের করে বিক্ষোভ মিছিল। সকালে বাংলা একাডেমীতে শিল্পী কলিম শরাফীর সভাপতিত্বে অসহযোগের সমর্থনে ব্রতচারী আন্দোলনের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসসমূহের ফেডারেশনের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান সরকারি অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ সমিতির এক সভায় বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। এছাড়াও এ দিন চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, ইপি ওয়াপদা অফিসার সমিতি, ইপি মৎস্য উন্নয়ন সংস্থার কর্মচারী সমিতি, পূর্ব বাংলা বীমা সংস্থাসমূহের কর্মচারী সমিতি, নোয়াখালী মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিস ও পেশাদার সংস্থাসমূহের ফেডারেশনের স্টিয়ারিং কমিটি প্রভৃতি সংস্থার পৃথক পৃথক সভায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচি মেনে চলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা আয়োজন করে সমাবেশের। এতে সভাপতিত্ব করেন আসাদুজ্জামান খান। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাহিত্যিক ও শিল্পীরা কবিতা পাঠ এবং গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। বিভিন্ন এলাকায় বাঙালির ওপর সামরিক বাহিনীর নির্যাতন আগের মতো অব্যাহত থাকে। রংপুর সেনানিবাস এলাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা পিলখানা, রামপুরা, ফার্মগেট, কচুক্ষেত, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, জোহা হল, মন্নুজান হল ও যশোর এলাকায় অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর চলতে থাকে অমানুষিক নির্যাতন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিদেশি বিমানে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা পরিবহন বন্ধ করার জন্য ভারত সরকার তার ভূ-খÐের ওপর দিয়ে সব বিদেশি বিমানের পূর্ব পাকিস্তান গমন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের আগে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন সংক্রান্ত পিপিপি চেয়ারম্যান ভুট্টোর প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা পৃথক বিবৃতি দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here