খালেদা জিয়া কি মুক্তি পাচ্ছেন

0
142

জামিনের ব্যাপারে আদেশ রোববার

নাসিরা আফরোজ রোজী: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের ব্যাপারে আগামী রোববার আদেশ দেবেন হাইকোর্ট। অভিজ্ঞ আইনজীবিরা বলছেন, ধরণের মামলায় হাইকোর্ট সাধারণত: জামিন দিয়ে থাকে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন ওহাইকোর্টেও গ্রহন করার কথা। কিন্তু হাইকোর্ট কি আদৌ তেমন আদেশ দেবে প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে সেই সাথে এই মামলায় হাইকোর্ট জামিন দিলেও সরকার কি অন্য কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারেই আটকে রাখবেন?

সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে খালেদা জিয়ার কারাবন্দীত্ব নিয়ে ভিন্নমত আছে। অনেকেই মনে করছেন, কারাদন্ড দেওয়ার পর বিএনপি চেয়াপার্সনের অবস্থান আরো সংহত হয়েছে। এমনকি খােেলদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির মধ্যে যে ভাঙনের সূর স্পষ্ট হবে তার পরিবর্তে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সংহতি বেড়েছে। সেই সাধে লন্ডনে অবস্থিত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের নেতৃত্ব আরো সংহত হয়েছে।

তবে সরকারের নীতি নীতিনির্ধারকদেও অপর একটি অংশ মনে কওে, খালেদা জিয়ার কারাদন্ডে আপাতত বিএনপি কিছুটা লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তাকে আটক রাখা জেলে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে  দলাদলিকোন্দল বাড়বে। এমনকি দলে ভাঙনের সৃষ্টি করাও সহজ হবে। সংশ্লিষ্ট সুত্র জানাচ্ছেক্ষমতাসীনদেও মধ্যে দুটি মতের কোনটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেছে নেবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বৃহস্পতিবার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জামিন আবেদনের ওপর আদেশের জন্য হাইকোর্টে আবেদন জানান তার আইনজীবীরা। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে সংক্রান্ত মেনশন ¯িø জমা দেন তারা। এরপর আদালত রোববার বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে হাইকোর্টের রোববারের দৈনন্দিন কার্যতালিকার এক নম্বর ক্রমিকে খালেদা জিয়া বনাম রাষ্ট্র মামলাটি আদেশের জন্য অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজার রায়ের বিরুদ্ধে গত ২২শে ফেব্রæয়ারি খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে নথি পাঠাতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালতে বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল ১৫ দিনের মধ্যে নথি পাঠানোর। ওই নথিপ্রাপ্তি সাপেক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিনের বিষয়ে আদেশ দেয়ার কথা জানিয়েছিলেন আদালত। ওই নথি পাঠানোর সময়সীমা শেষ হয়েছে। এখন তার জামিনের বিষয়ে আদেশের জন্য বিষয়টি কার্যতালিকায় রাখা হোক।

পর্যায়ে আদালত বলেন, বিচারিক আদালত থেকে রেকর্ড এসেছে কিনা? আমরা নথি পাঠানোর জন্য ২২শে ফেব্রæয়ারি আদেশ দিয়েছিলাম। এরপরই হাইকোর্ট রোববার আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী, এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, কায়সার কামাল, আমিনুল ইসলাম, রাগীব রউফ চৌধুরী, সগীর হোসেন লিয়ন প্রমুখ এবং দুদকের পক্ষে খুরশীদ আলম খান উপস্থিত ছিলেন।

কারাগারে মাসেরও বেশী

কারাগারে একমাসেরও বেশী সময় কেটে গেছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার। দীর্ঘ এক মাস। কারাগারে বন্দি বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের দ্বিতীয় তলার কক্ষে কাটছে তার দিনরাত। সঙ্গে আছেন গৃহপরিচারিকা ফাতেমা। শান্ত, ধীরস্থির খালেদা জিয়া। থাকাখাওয়ার ব্যাপারে কোনো দাবিদাওয়া নেই তার। বরং বলে দিয়েছেন, আমাকে নিয়ে কোনো ক্ষেত্রে বিব্রত হবেন না। আপনাদের দায়িত্ব   আপনারা পালন করেন। আপনারা তো চাকরি করেন, তাই আপনাদের কারও প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কেমন আছেন খালেদা জিয়া, জানতে চাইলে গতকালই তার সঙ্গে দেখা করে আসা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, উনি মানসিকভাবে শক্ত আছেন, পরিবেশটা ভালো না। পুরনো বাড়ি। সবচেয়ে বড় বিষয় তার একাকিত্ব।

বিশাল কারাগারে একমাত্র বন্দি খালেদা জিয়া। সূত্র মতে, শুরুতে তার একার জন্যই রান্না করা হতো কারাগারে। ডিভিশন পাওয়ার পর তার পছন্দের খাবার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কর্মরতদের তিনি জানিয়েছেন, কারা কর্তৃপক্ষ নিয়মানুসারে তাকে যা খেতে দেবেন তিনি তাই খাবেন। এর বাইরে তার কোনো আবদার নেই। ওই সময়ে তিনি বলেন, অফিসারদের বলবেন, আমার একার জন্য রান্না করার দরকার নেই। স্টাফদের জন্য যা রান্না করা হয় আমি তাই খেতে পারবো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই কথা পৌঁছে যায় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে। তারপর থেকে একই হাঁড়িতে রান্না করা হচ্ছে খালেদা জিয়া   ডিপ্লোমা নার্স এবং কর্মরত প্রহরীদের খাবার। তবে তার পছন্দ অনুসারে কিছুদিন পরপর বেশ কয়েক বার শিং মাছ রান্না করা হয়েছে। মঙ্গলবার রান্না করা হয়েছে গরুর মাংস, ডাল সবজি। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে কেরানীগঞ্জ থেকে মাছ, মাংস, সবজিসহ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দিয়ে যান সেখানকার দায়িত্বরত প্রহরী।

রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন বাবুর্চি ইদ্রিছ। সূত্রমতে, কয়েক দিন আগে রান্নাবান্নার জন্য ইদ্রিছকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেইসঙ্গে খাবারে ঝাল কম দিলে ভালো হয় বলে জানিয়েছিলেন। রান্না করা খাবার যথাসময়ে খালেদা জিয়ার কক্ষে নিয়ে যান নারী প্রহরী। সকাল রাতের খাবার প্রায়ই দেরি করে খান খালেদা জিয়া। ফাতেমা ডিপ্লোমা নার্স কারারক্ষী নারীদের তিনি বলেছেন, তোমরা খেয়ে নিও, আমার জন্য অপেক্ষা করো না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একথা বললেও তার জন্য অপেক্ষা করেন অন্যরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা হাতে নেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হন। বিকালে বারান্দায় যান। ওই কক্ষে একটি বারান্দা। যেখান থেকে কারাগারের প্রাক্তন মহিলা ওয়ার্ড ছাড়া বাইরের কিছুই দেখা যায় না। দীর্ঘ সময় ওই বারান্দায় অবস্থান করেন খালেদা জিয়া।

রাতে বিছানায় যান দেরিতে। কর্মরতদের জীবনযাপনের খোঁজখবর নেন। কখনো কখনো দেশের সাম্প্রতিক বিষয়ে কথা বলেন। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, তিনি কথা বলেন খুব কম। শুয়ে, বসে, পত্রিকা পড়েই সময় কাটান। সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া কাপড়, তোয়ালে বিছানার চাদর ব্যবহার করছেন খালেদা জিয়া। কারাগারে নিয়মিত বসেন একজন ডাক্তার। সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। আবার বিকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কারাগারের অফিস কক্ষে বসেন তিনি। এরমধ্যেই খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন চিকিৎসক।  অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্ণেল মো. ইকবাল হাসান জানান, খালেদা জিয়াকে বিধি অনুসারেই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কারাগারে একজন চিকিৎসক ডিপ্লোমা নার্স রয়েছেন। তারা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত সেবা দিচ্ছেন। তিনি সুস্থ আছেন বলে জানান কর্নেল ইকবাল হাসান।

উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ৮ই ফেব্রæয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে Ð দেন আদালত। তারপর থেকেই পুরান ঢাকার ওই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে রয়েছেন তিনি। ১০ই ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত নিচতলার জেল সুপারের অফিস কক্ষে রাখা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। পরবর্তীতে ডিভিশন পেলে তাকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই কক্ষটি এক সময় কারাবন্দি নারীদের শিশুদের ডে কেয়ার সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে খালেদা জিয়া ছাড়াও তার গৃহকর্মী ফাতেমা, ডিপ্লোমা নার্স নিরাপত্তার দায়িত্বে চার নারী কারারক্ষী রয়েছেন। তবে এই কারাগার অধিদপ্তরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ১৪৭ জন কারারক্ষী।

তারেক রহমানের নেতৃত্ব সংহত

চেয়ারপারসনকে ছাড়াই এই  এক মাস রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে দলটির। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কারাগার থেকে রাজনৈতিক নির্দেশনা দেয়ার সুযোগ নেই চেয়ারপারসনের। আইনি জটিলতার কারণে আগে থেকেই লন্ডনে অবস্থান করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। গণমাধ্যমের প্রতি উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তারেক রহমানের বক্তব্যবিবৃতি প্রচারে।

নেতাদের ওপর একদিকে কড়া আন্দোলনের চাপ তৃণমূলের, অন্যদিকে দলে ভাঙন ধরানোর নানামুখী ষড়যন্ত্র প্রতিহতের চ্যালেঞ্জ। পদে পদে ভুলের ফাঁদ, নৈরাজ্যের উস্কানি। পরিস্থিতি রীতিমতো শাঁখের করাত। কিন্তু এখন পর্যন্ত সকল ফাঁদ এড়িয়ে, উস্কানি অগ্রাহ্য করে, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পাশাপাশি নেতারা অহিংস কৌশলে এগিয়ে নিচ্ছেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। দল পরিচালিত হচ্ছে একটি যৌথ নেতৃত্বে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে নির্দেশনা সিনিয়র নেতাদের আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর্মকাÐ সমন্বকের দায়িত্ব পালন করছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই এক মাসে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে তারেক রহমানের সঙ্গে সিনিয়র নেতাদের দূরত্বের ব্যাপারে প্রচারণাটি। খালেদা জিয়া, তারেক রহমান জিয়া পরিবারের নেতৃত্বের প্রতি সারা দেশের নেতাকর্মীদের আস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নতুন করে। দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সবখানেই সুদৃঢ় হয়েছে নেতাকর্মীদের ঐক্য। খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় নৈরাজ্যের সমূহ আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন ঊর্ধ্বমুখী করেছে বিএনপি। এসময় প্রাধান্য পেয়েছে আন্দোলন কর্মসূচি। দলের এমন রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দল জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতাকর্মীদের নির্দেশনা প্রদান, চেয়ারপারসনের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখা, কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ মিলিয়ে রীতিমতো ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর এক মাসের মাথায় ৭ই মার্চ বুধবার কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ জন। কারাগারে চেয়ারপারসনের সঙ্গে দলটির নীতিনির্ধারক ফোরামের এতজন নেতার সাক্ষাতের অনুমতি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। তবে চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে দলটির মহাসচিবসহ নেতারা জানিয়েছেন পুরনো পরিত্যক্ত কারাগারের বদ্ধ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে একাকিত্বের মধ্যেও মনোবল অটুট রয়েছে খালেদা জিয়ার। প্রথম তিনদিন ডিভিশন পাননি। কারাগারে খাচ্ছেন সাধারণ খাবার। ডান হাত হাঁটুতে সমস্যাসহ বয়সজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। বাইরের চিকিৎসকের পরামর্শসহ চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন তার। এত কিছুর পরও মনোবল হারাননি খালেদা জিয়া। নেতাদের পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, দেশ গণতন্ত্রের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত তিনি। বিএনপির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন নিয়মতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের। কোনো ধরনের উস্কানিতে পা না দিতে করেছেন সতর্ক।

আইনজীবীরা সবাই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে লড়ছেন একাট্টা হয়ে।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পর দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কয়েকটি বৈঠক করেছে বিএনপি। সেসব বৈঠকে নিজেদের পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরার পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন নেতারা। জোটের নেতাদের সঙ্গেও একটি বৈঠক করেছে বিএনপি। এসব বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নির্দেশনাগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে গ্রহণ করেছেন সিনিয়র নেতারা। এছাড়া একাধিক পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি।

কূটনীতিক তৎপরতা জোরদার

খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর কূটনীতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বিএনপি। কূটনীতিকদের ডেকে ব্রিফ করার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিকভাবে কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন দলটির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ১১ই ফেব্রæয়ারি দলটির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের দুই কূটনীতিক। সেখানে অবস্থানরত দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন তারা। দুদিন পর ১৩ই ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক সংস্থার কূটনীতিকদের ব্রিফ করে বিএনপি। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের আইনের লঙ্ঘন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত চার্জশিট, সাক্ষ্যপ্রমাণে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, বিচারপ্রক্রিয়ায় দ্রæততা, কারাগারে ডিভিশন না দেয়া, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনে বিএনপিসহ দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের দাবি এবং বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির সে ব্রিফে অংশ নেন অন্তত ৪০টি দেশ সংস্থার প্রতিনিধিরা।

বাংলাদেশ সফরকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা লিসা কার্টিসের সঙ্গে ৪ঠা মার্চ সাক্ষাৎ করেন বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। সফরে লিসা কার্টিসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের শিডিউল না থাকলেও তিনি দেশে ফেরার আগে সাক্ষাতের সুযোগ মেলে বিএনপি নেতাদের। ওই বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কারাবাসসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি খালেদা জিয়াসহ সারা দেশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমানহয়রানিমূলক মামলা সংক্রান্ত ৪টি ডকুমেন্ট বইও তাকে হস্তান্তর করেন বিএনপি নেতারা।

এছাড়া ইইউ পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন দলটির নেতারা। কয়েক দিন আগে বৃটিশ হাইকমিশনারের বাসায় দেশটির কয়েকজন এমপি সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। বিএনপির কূটনীতিক উইংয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন নেতা জানান, দেশে বিদেশে বিএনপি নেতাসহ শুভাকাক্সক্ষীরা কূটনীতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। ইতিমধ্যে কিছু বিষয়ে ইতিবাচক সাড়াও মিলছে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জটিলতার ব্যাপারটি কূটনীতিকরা উপলব্ধি করতে পারছেন। চলমান পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিয়েছে বিএনপি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোনো দল নয়, দেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিবিড় করার ব্যাপারে সম্প্রতি ঢাকাকে বার্তা দিয়েছে দিল্লি। সব মিলিয়ে অহিংস কৌশলে দলের চেয়ারপারসনের কারামুক্তি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, রাত যত গভীর হয়, দিনের আলো তত নিকটে আসে।  

নেতার সাক্ষাৎ: উস্কানিতে পা না দেয়ার পরামর্শ

দেশ গণতন্ত্রের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেইসঙ্গে কোনো ধরনের উস্কানিতে পা না দেয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। কারাবন্দি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সিনিয়র নেতাদের সোয়া ঘণ্টা সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের কথা জানান। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। বিকাল সোয়া তিনটার সময় আমরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুুযোগ পেয়েছি। দেশনেত্রীর মনোবল অত্যন্ত উঁচু।

তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশকে মোকাবিলা করছেন। কারারুদ্ধ অবস্থায়ও তিনি দেশের জন্যই চিন্তা করছেন। মির্জা আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া জানিয়েছেনআপনাদের মাধ্যমে (গণমাধ্যম) দেশবাসীকে জানানোর জন্য, তিনি সুস্থ আছেন। তিনি ভালো আছেন। তিনি দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করে এতটুকু বুঝতে পেরেছি, তার মনোবল অত্যন্ত উঁচু আছে। সত্যের পথে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন। আমরাও মনে করি সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বে আইনিভাবে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি মামলা দিয়ে তাকে আজকে কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন কারচুপির মধ্যদিয়ে, বিভিন্ন ছলচাতুরি করে তার কারাবাসকে দীর্ঘ করার চেষ্টা করছে। এর সবকিছুই দূরীভূত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। মির্জা আলমগীর বলেন, আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে রাজনৈতিক সংগ্রাম, সে সংগ্রামও চলছে খালেদা জিয়াকে মুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here