মিয়ানমার সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা : সৈন্য সমাবেশ ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন

0
242

সাইদুল হাসান: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আচমকা সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে মিয়ানমার। তারা ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে টহল দিচ্ছে। তাদের তরফে ব্যাপক উস্কানিও রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে এখন টান টান উত্তেজনা। গত বুধবার থেকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা নিয়ে মূলত টান টান এ উত্তেজনা।
আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বিপুলসংখ্যক সেনা ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করেছে মিয়ানমার। তমব্রæ সীমান্তে শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শিবিরে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর ওই সেনারা অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে এবং গুলি ছোড়ে। মিয়ানমারের সেনা মোতায়েনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও সীমান্তে জনবল বাড়িয়েছে। মিয়ানমার বাহিনীর মহড়ার পর থেকে বাংলাদেশের তমব্রæ সীমান্তেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তুমব্রæ গ্রামের বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা আজ মিয়ানমার সীমান্তে সেনা ও বিজিপির সশস্ত্র উসকানিমূলক অবস্থান দেখে ভয় পাচ্ছি। কখন কী ঘটে যায়! গতকাল সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পরপরই সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।’
গত ২০শে ফেব্রæয়ারি দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতে, মিয়ানমার সরকার সীমান্তের কোনার পাড়া এলাকার নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পর্যায়ক্রমে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। কিন্তু তা না করে উল্টো বুধবার থেকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থারত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছে সে দেশের সেনারা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত সেনা ও ভারি অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাতে সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। তমব্রæ কোনারপাড়া সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি দেখানো অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার। সীমান্তে সেনা সদস্য বৃদ্ধি ও তাদের অব্যাহত মাইকিং-এর ফলে নো-ম্যানস ল্যান্ডের আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় করছে।
এদিকে বাংলাদেশও সীমান্ত এলাকায় তাদের শক্তি বাড়িয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি শক্তি বৃদ্ধির ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া সাড়ে ৬ হাজার রোহিঙ্গাদের মধ্যে অধিকাংশ রোহিঙ্গাই সরে গেছে তুমব্রæ সীমান্ত থেকে। আজও বেশ কিছু রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়ে জিরো পয়েন্ট ছেড়ে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে অসুস্থ বা বয়স্ক অনেক রোহিঙ্গা কুতুপালং ও বালুখালীর বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন। এছাড়া মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মাইকিংয়ের মাধ্যমে অনবরত ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে পালিয়ে গেছে। স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের মাইকিংয়ে বিব্রত না হওয়ার অনুরোধ করলেও অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
ওদিকে সীমান্তে মিয়ানমারের সেনা সমাবেশ ও ভারি অস্ত্র মোতায়েনের বিপরীতে সর্তক অবস্থান নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাড়ানো হয়েছে টহল ও সদস্য সংখ্যা। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. মুজিুবর রহমান। বৃহস্পতিবার বিকালে পিলখানাস্থ বিজিবি’র সদর দপ্তরে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, প্রায় ১৫০ গজ অভ্যন্তরে সেনা সামবেশ ঘটিয়েছে মিয়ানমার। সেখানে কিছু ভারি অস্ত্র মোতায়েন করেছে। বিষয়টি গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে বিজিবির শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই অবস্থায় বিজিবিও সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি।
তিনি বলেন, তমব্রæর জিরো লাইন এলাকায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এলাকাটি মিয়ানমার অংশে। গত কিছুদিন ধরে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ ও সেনাবাহিনী তমব্রæ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া, সেগুলো আরও মজবুত করা ও উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন সার্ভেলেন্স ইকুয়েপমেন্ট স্থাপন করার কাজ করছে। শব্দ যন্ত্রের মাধ্যমে সেখানকার রোহিঙ্গাদের স্থান ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে। তাদের বাধ্য করা হচ্ছে তারা যেন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বলা হচ্ছে, আপনারা এখানে থাকতে পারবেন না। গত এক মাস ধরেই এটি চলছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, আমরা আশা করি তারা ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের জবাব দেবে। পতাকা বৈঠকে সাড়া না দিলে বিজিবির করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মুজিবুর রহমান বলেন, বর্ডার এলাকায় সেনা সমাবেশ করা বর্ডার নর্মসের বাইরে। আমরা এটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে।
অন্যান্য ফোর্সকে সেখানে নিয়োজিত করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়নি যে অন্য ফোর্সকে সেখানে অবস্থান নিতে হবে। বর্ডারে যে পরিমাণ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, মিয়ানমার কেন হঠাৎ সীমান্ত এলাকায় এত জনবল ও অস্ত্র মোতায়েন করেছে তা জানার চেষ্টা চলছে।
গত ১০ই ফেব্রæয়ারি থেকে তমব্রæ কোনাপাড়ার জিরো পয়েন্ট বরাবর অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সেখানে পাঁচ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের ওই এলাকা ছাড়তে মাইকিং করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তারা মাইকে প্রচার করছে, ওই স্থানটি মিয়ানমারের তাই সেখানে অবস্থান করা যাবে না। সীমান্ত শূন্যরেখায় অবস্থান করা আইনের পরিপন্থি। এছাড়া মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে, ওই স্থানটি মংডু জেলার আওতাধীন। মংডু জেলায় বর্তমানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বিধায় অবৈধভাবে অবস্থান করা যাবে না। মিয়ানমার সীমান্ত বাহিনীর অপপ্রচার ও ভীতি প্রদর্শনের ফলে শূন্যলাইনে অবস্থানরত মিয়ানমার নাগরিকরা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিল। এতে কঠোর নজরদারি ও টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করে বিজিবি। সতর্কতার সঙ্গে অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা হচ্ছে। এরমধ্যেই গতকাল সকালে তমব্রæ বিওপির দায়িত্বাধীন সীমান্ত পিলার ৩৪ ও ৩৫-এর মধ্যবর্তী কোনাপাড়া শরণার্থী শিবিরের কাছে অবস্থান নেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সীমান্ত থেকে আনুমানিক ১৫০ গজ পূর্ব-দক্ষিণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পাহাড়ের ওপর বাংলাদেশের দিকে মুখ করে একটি ৬০ কিলোমিটার মর্টার ও মেশিনগান স্থাপন করেছে বলে জানা গেছে। মোতায়েনকৃত অতিরিক্ত জনবলের নেতৃত্বে রয়েছেন টিওসি স্পেশাল কমান্ডার (কর্নেল পদবির) একজন সেনা কর্মকর্তা। সূত্র জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়নের জন্য তারা সিসি ক্যামেরা, আইআর, দূরবীক্ষণ যন্ত্র, বাইনোকুলারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি স্থাপন করেছে।
রোহিঙ্গাদের মাঝে আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কয়েকটি ট্রাক এবং মোটরসাইকেল যোগে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নেয়। তারা মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে চলে যেতে হুমকিধমকি দেয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইটপাটকেল ছুড়ে। আতঙ্কে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গারা চিৎকার হৈ-হুল্লোড় করে বাংলাদেশে ঢোকার জন্য কয়েকটি স্থানে জড়ো হয়। খবর পেয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তুমব্রæ পয়েন্টে বিজিবি টহল এবং প্রহরা বাড়ায়। অতিরিক্ত সদস্যও মোতায়েন করা হয় সীমান্ত এলাকায়। ঘটনার বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরওয়ার কামাল জানান, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার ট্রাক-পিকআপে করে অতিরিক্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী জড়ো করেছে মিয়ানমার। সীমান্তের তুমব্রæ কোনাপাড়া নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তবে আশঙ্কার কিছু নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে বিজিবি এবং প্রশাসন। শূন্যরেখায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং সভায় আশ্বস্তও করেছে মিয়ানমার। বিজিবি কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আবদুল খালেক জানান, মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় প্রায় সময় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে থাকে। আবার পরবর্তীকালে সরিয়ে নেয়। কিন্তু হঠাৎ করে তুমব্রæ সীমান্তে কেন অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বুঝতে পারছি না।
মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব
বান্দরবানের তুমর্রু সীমান্তে উত্তেজনা নিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত লুইন উ কে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম খোরশেদ আলম তাকে তলব করেন। এরপর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে একটি নোট ভারবাল দেয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমর্রু সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তাকে এও বলা হয় যে, এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ভালো নয়। উল্লেখ্য, গত ফেব্রæয়ারি মাসে দুইদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ না করার জন্য আহবান জানানো হয়।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here