৩৫ বছরে পঞ্চমবার:কারাগারে যেভাবে আছেন খালেদা জিয়া

0
199

রাজিব আহসান: সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে রাজনীতিতে জড়ানো খালেদা জিয়ার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আরো চারবার অন্তরীণ হয়েছিলেন। সেনাশাসক এরশাদের সময়ে তিন দফায় তাকে গৃহবন্দি করা হয়। ১/১১ সরকারের সময় এমপি হোস্টেলে স্থাপিত সাবজেলে অন্তরীণ ছিলেন তিনি। তবে এবারই প্রথম কোনো মামলায় দÐ নিয়ে কারাগারে গেলেন তিনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের সময়ে এই প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনো সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাগারে গেলেন। আর স্বাধীনতার পর দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পর খালেদা জিয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে কারাগারে গেলেন।
৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে ১৯৮৩ সালের ২৮শে নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩রা মে, ১৯৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হতে হয় খালেদা জিয়াকে। তখন তাকে সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাড়িটিতে গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ ১/১১ এর জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। ১ বছর ৭ দিন সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে বন্দি রাখা হয়েছিল তাকে। পাশের বাড়িতে বন্দি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পান। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবির মুখে রাজনীতিতে নামেন খালেদা জিয়া। প্রথমে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হন তিনি, এক বছর পর ১৯৮৪ সালে নেন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। তারপর ৩৪ বছর ধরে একই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনড় ভূমিকা পালন করে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ‘আপসহীন’ নেত্রীর আখ্যা পান খালেদা জিয়া। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের এবং মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি। ১৯৯১ সাল থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় তিনি যে কয়টিতে লড়েছেন তার সবক’টিতেই জয়ী হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের আন্দোনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাকে। পরে নির্বাচনে হেরে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন। পাঁচ বছর বিরোধী দলে থাকার পর ২০০১ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসে বিএনপি। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। জরুরি জমানার সরকারের পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আবার বিরোধী দলের আসনে বসেন খালেদা জিয়া। কিন্তু সর্বশেষ ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করার পর থেকে সংসদের বাইরে খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। ওই সময় বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন চলার সময় তিন মাস কার্যত দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের ঐতিহাসিক পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করেছে কারা প্রশাসন। এর আগে বকশীবাজারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থেকে তাকে একটি সাদা গাড়িতে করে র্যা ব পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় কারাগারে নেয়া হয়। এ সময় পুরো এলাকার পরিবেশ ছিল নীরব, নিস্তব্ধ।
খালেদা জিয়াকে কারাগারের মহিলা ওয়ার্ডের ডে-কেয়ার সেন্টারের তিন তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীর মর্যাদা দিয়ে রাখার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ নতুন খাট, টেবিল, চেয়ারসহ অন্যান্য আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কারা সূত্রে জানা গেছে। কারাগারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কারাগারে প্রবেশ করার পরই খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। কারা ডাক্তার মাহমুদুল হাসান তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, খালেদা জিয়ার ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীর কাগজপত্র কারাগারে না আসায় তাকে সাধারণ বন্দীর মতোই থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আর রাতের খাবারের মেনুতে দেয়া হয়েছে সাদা ভাত, মাছ, সবজি ও ডাল। তবে তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক রয়েছেন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
এর আগে বকশীবাজারের বিশেষ আদালত থেকে একটি সাদা গাড়িতে করে পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে নেয়া হয় ২০০ বছরের ঐতিহাসিক পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে।
খালেদা জিয়ার সহকারী ফাতিমাকে কারাগারে তার সাথে থাকবেন বলে প্রথমে জানানো হলেও পরে জানা গেছে, তাকে থাকার অনুমতি দেয়া হয়নি। কাশিমপুর থেকে ৬ কয়েদীকে দেয়া হয়েছে বেগম জিয়ার সাথে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বকশীবাজারের মাঠ থেকে কারা অধিদফতরের উল্টো দিকে ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজনের অফিস এলাকা দিয়ে গাড়ির বহরটি নাজিমুদ্দিন রোড হয়ে কারাগারের প্রধান ফটকে পৌঁছে। যখন খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সামনে কয়েকটি গাড়ি ছাড়াও দুই শতাধিক হেলমেট পরা র্যা ব পুলিশ সদস্যের বেষ্টনীর ভেতরে ছিলেন খালেদা জিয়া। এরপর পেছনে ছিল আরো কয়েকটি নিরাপত্তা কর্মকর্তার গাড়িবহর। কারাগারে নেয়ার সময় পর্যন্ত পুরো এলাকাটি ছিল নীরব, নিস্তব্ধ। শুধু আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হেঁটে যাওয়ার শব্দই জনতা শুনতে পাচ্ছিলেন।
এর আগে কারাগারের চতুর্দিকের অদূরেই পুলিশ র্যা ব ও বিজিবির সদস্যরা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। বিকেলে খালেদা জিয়ার তিন আইনজীবী কাপড় ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কারাগারে পৌঁছে দিয়ে আসেন।
পরিবারের একজন জানান, খালেদা জিয়া স্বল্পাহারী। প্রতিদিনের খাওয়ার রুটিনে সকালে তিনি একটু রুটি ও সবজি খান। সাথে এক কাপ চা অথবা কফি পান করেন। মাছ, গোশত, ডিম তিনি কম খান। তবে চচ্চড়ি তার খুব পছন্দ বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here