রাজনীতি কোন পথে :বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান

0
231

আফজাল আহমেদ: খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে তারেক রহমান। রায়ের পর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, গঠনতন্ত্রে দল পরিচালনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। সেই অনুযায়ী দল চলবে।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, দলের গঠনতন্ত্রে আছে চেয়ারপারসন কোনো কারণে সাময়িকভাবে অনুপস্থিত থাকলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। এটাই গঠনতন্ত্রের বিধান। উল্লেখ্য, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৮ ধারায় রয়েছে চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান।
কত দিন জেলে থাকতে হতে পারে
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদÐ দেয়া হয়েছে। তবে তার আইনজীবীরা বলেছেন, তারা আপিল করবেন। তার দল বিএনপি বলেছে, এ রায়কে তারা আইনি ও রাজনৈতিক উভয়ভাবেই মোকাবিলা করবে। অনেকের মনেই এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে তাহলে খালেদা জিয়াকে আসলে ঠিক কত দিন জেলে থাকতে হতে পারে?
আইনবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহদীন মালিক বলছেন, রায়টা কতটা ঠিক হয়েছে তা বোঝা যাবে উচ্চতর আদালতে আপিল শুরু হলে। প্রশ্ন হলো রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পাবার পরই কেবল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন, এবং ততদিন পর্যন্ত খালেদা জিয়া বন্দী থাকবেন। এই রায়ের কপি পাবার কি কোন সময়সীমা আছে?
শাহদীন মালিক বলছেন, কোনোা সময়সীমা বাঁধা নেই। তবে সার্টিফায়েড কপির আগে টাইপ করা কপি যাকে বলা হয় ট্রু কপি – সেটা হয়তো আইনজীবীরা আগামি সপ্তাহের প্রথম দিকেই পেয়ে যেতে পারেন এমন কথা শোনা গেছে। তাহলে তারা হয়তো আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদই আপিল দায়ের করে দেবেন, হয়তো আপিলের সাথেই জামিনের আবেদনও করবেন।
“আইনি প্রক্রিয়ায় যেটা হয়, নারীদের ব্যাপারে, বয়েস বেশি হলে, বা সাজা কম বলে – কারণ এটা যাবজ্জীবন কারাদÐ নয় এবং পাঁচ বছরের কারাদÐকে কম সাজাই বলতে হবে – তাই এসব বিবেচনায় হয়তো আমার সাধারণ জ্ঞানের যেটা ধারণা হয় – জামিন হয়ে যেতে পারে।”
“এক বা দু’সপ্তাহে ছাড়া পেয়ে গেলে এক অর্থে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন, রাজনৈতিক কর্মকান্ডও শুরু করতে পারবেন।”
বিএনপির রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলছেন, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কিনা – তার চাইতেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে : নির্বাচনের সময় তিনি জেলের ভেতরে থাকবেন না মুক্ত থাকবেন।
আসিফ নজরুলের কথায়, খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না-ও পারেন, তবুও তিনি যদি জামিনে থাকেন এবং প্রচারাভিযানে অংশ নিতে পারেন – তাহলে এই কারাদÐ বিএনপির জন্য নেতিবাচক না হয়ে বরং ইতিবাচক হতে পারে।
“কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোন কারণে যদি বেগম জিয়া জামিন না পান, এবং তার বিরুদ্ধে আরো মামলা রয়েছে সেটাও মনে রাখতে হবে – তিনি যদি ক্যাম্পেইনটা করতে না পারেন বিএনপি পরিস্থিতিটা কতটা কাজে লাগাতে পারবে – সেটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকবে” – বলেন তিনি। তাই বেগম জিয়া নির্বাচনের সময় জামিনে মুক্ত থাকবেন কিনা এটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
আরো ৩৬ মামলা
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ৩৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি দুদকের দায়ের করা মামলা। দুর্নীতির মামলাগুলো বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় দায়ের করা হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ছাড়া অন্যগুলো হলো, নাইকো, গ্যাটকো এবং বড়পুকুরিয়া মামলা। এ ছাড়া বাকি মামলাগুলো পুলিশের কাজে বাধা, নাশকতা, ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে করা হয়েছে গত ৯ বছরে।
গত ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা আরো ১৪টি মামলা ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে বকশিবাজারে আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। মামলাগুলো ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ছিল।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানা উল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রায় ৩৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার জন্য রয়েছে। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।
এর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বকশিবাজারে স্থাপিত ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ ড. মো: আকতারুজ্জামানের আদালতে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। আগামী ২৫ ও ২৬ ফেব্রæয়ারি এ মামলায় আসামিপক্ষের পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ ধার্য রয়েছে। এ মামলার আসামি ড. জিয়াউল ইসলাম মুন্নার আইনজীবী মো: আমিনুল ইসলাম প্রথমে আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন।
গত ২৫ জানুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ৩০, ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রæয়ারি তারিখ ধার্য করা হয়। ওই দিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় এবং আগামী ৮ ফেব্রæয়ারি ওই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়।
অন্য দিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা ১১ মামলার শুনানির তারিখ পরিবর্তন করেছেন আদালত। মামলাগুলোর মধ্যে রাজধানীর দারুস সালাম থানার নাশকতার আট মামলার শুনানির পরবর্তী তারিখ ১২ মার্চ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের একটি ও যাত্রাবাড়ী থানার দুই মামলার পরবর্তী তারিখ ১০ এপ্রিল ধার্য করেছেন আদালত। বকশিবাজারের কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা আদালত এ দিন ঠিক করেন।
১১ মামলার মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার একটি মামলা অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। অপর ১০ মামলা ছিল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য। কিন্তু মামলাগুলোর মধ্যে খালেদা জিয়ার পে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বেশির ভাগ মামলা হাইকোর্ট স্থগিত করেছেন জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
আইনজীবীরা জানান, ১১ মামলার মধ্যে তিন মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন এবং অন্য আট মামলা রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছেন।
রায়ের কপি পেলেই আপিল : ব্যারিস্টার মওদুদ
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার রায়ের কপি হাতে পেলেই উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রায়ের কপি পেতে। যতক্ষণ পর্যন্ত না কপি পাবো ততক্ষণ আইনজীবীদের সেখানে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। রায়ের কপি পেলেই রোববার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ফাইল করা হবে। সাথে সাথে জামিন চাওয়া হবে
‘এই রায়ের ফলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না’ আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন লাভ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি না তা কি আইনমন্ত্রী ঠিক করবেন। আইনমন্ত্রী তো ঠিক করবেন না। যদি প্রয়োজন পড়ে তা আদালতে গড়াবে। তখন সুপ্রিম কোর্টই সিদ্ধান্ত দেবে যে তিনি পারেন কি পারেন না। আমাদের মতে, তিনি পারেন। আমরা মনে করি আপিল হলো ‘কনটিনিউশন অব ট্রায়াল’। এটা হলো ‘ফার্স্ট কোর্ট’, এরপর হাইকোর্ট, তারপর সুপ্রিম কোর্ট আছে। সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অবশ্যই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
সংবিধান লঙ্ঘন করে খালেদা জিয়ার বিচার করা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, যে আদালতে উনার (খালেদা জিয়া) বিচার হলো, আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে আছে যে ‘বিচার হতে হবে পাবলিক’। উন্মুক্ত বিচার হতে হবে। কিন্তু এই বিচার পাবলিক হয় নাই। কারণ অনেক আইনজীবীকে দীর্ঘকালের ট্রায়ালের সময় সেখানে যেতে দেয়া হয়নি।
খালেদা জিয়ার বিষয়ে বিচারক কিছু বলেননি
রায়ে বিচারক খালেদা জিয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি মন্তব্য করে সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, প্রিভেনটিভ অব করাপশন অ্যাক্ট ওই মামলাটা দুই রকম। একটা হলো ৪০৯, ১০৯ পেনাল কোডের অধীনে। আরেকটা হলো প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে। কিন্তু বিচারক যে রায় দিলেন ৫ ধারার অধীনে উনাকে (খালেদা জিয়া) সাজা দেয়া হয়নি। অর্থাৎ দুর্নীতির যে কথা বলা হচ্ছে পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে ৫.২ ধারা হলো পাবলিক সার্ভেন্টের জন্য, অথচ ৫.২ ধারার অধীনে তিনি কোনো অপরাধ করেননি। তা এই রায়ের মাধ্যমে আমরা বুঝলাম। কারণ এই রায়ে ওনার (খালেদা জিয়া) শাস্তি দিয়েছেন ৪০৯ এর অধীনে। ৪০৯ এর অধীনে উনার সাজা হতে পারে না কারণ কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া এই রায় দেয়া হয়েছে। আমরা যখন পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাবো তখন অবশ্য আমরা পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে পারব।
ফৌজদারি নয় রাজনৈতিক মামলা : খালেদা জিয়ার মামলাকে রাজনৈতিক মামলা উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, এটা কোনো ফৌজদারি মামলা না এটা একটা রাজনৈতিক মামলা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই মামলা পরিচালনা করা হয়েছে এবং নি¤œ আদালত সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। এই বিষয়টি নিয়েই সাবেক বিচারপতি এস কে সিনহার সাথে সরকারের দ্ব›দ্ব ছিল। মূল সংবিধানে (৭২’র সংবিধানে), আওয়ামী লীগের করা সংবিধানে ছিল এই দায়িত্ব হবে সুপ্রিম কোর্টের। নি¤œ আদালতের বিচারকেরা তাদের পদায়ন, তাদের নিয়োগ, তাদের শৃঙ্খলা, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সব কিছু সুপ্রিম কোর্ট করবে। কিন্তু তাকে পাল্টিয়ে চতুর্থ সংশোধনীতে সুপ্রিম কোর্টকে বাদ দিয়ে তারা প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এসেছে। সেই প্রেসিডেন্ট মানে হলো তিনি তো নির্বাহী বিভাগেরই। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া তার পক্ষে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব না। একটার পর একটা আইন এবং সংবিধানকে লঙ্ঘন করে যে রায় দেয়া হলো এই রায়টা আমরা মনে করি আইনসম্মত হয়নি। এটা সাক্ষ্য ও প্রমাণভিত্তিক হয়নি। এটাকে একটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here