খালেদা কারাগারে: দেশব্যাপী থমথমে অবস্থা

0
33

খালেদা জিয়ার ৫ বছর কারাদণ্ড,তারেক রহমানসহ ৫ জনের ১০ বছর

নাসিরা আফরোজ রোজী: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদÐ দেয়া হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালত বৃহস্পতিবার এ রায় দেন। রায়ের পরপরই বেগম খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে গ্রেফতার করে পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১০ বছর সশ্রম কারাদÐ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় অপর চার আসামিকেও ১০ বছর করে সশ্রম কারাদÐ দেয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া অপর আসামিদের প্রত্যেককে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট থেকে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া এ মামলায় অপর যে চার আসামিকে কারাদÐ দেয়া হয়েছে তারা হলেন- মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ।
প্রায় ১০ বছরের মাথায় রায় দেয়া হলো এ মামলার। ২০০৭ সালে সাব জেলে বন্দী থাকার পর বেগম খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে দ্বিতীয়বার কারাবন্দী হলেন।
বিএনপি নেতা ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বারবার এ মামলাকে মিথ্যা, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক এবং বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চক্রান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও তারা বারবার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ন্যায়বিচার হলে অবশ্যই বেগম জিয়া সম্পূর্ণ খালাস পাবেন। তারা আরো বলেছেন, সরকারি দলের লোকজনের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে রায় আগে থেকেই সাজানো রয়েছে।
এদিকে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদন্ডে দন্ডিত করার নিয়ে দেশব্যপী থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বৃস্পতিবার থেকেই বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সরকার সমর্থকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। মগবাজার থেকে শুরু করে বকশীবাজার পর্যন্ত এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসানসহ এক হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন বলে বিএনপি দাবি করেছে। পুলিশ কাকরাইলে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। হলিফ্যামিলি হাসপাতালের মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালায় পুলিশ ও সরকার সমর্থকেরা। পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা সেখানে হামলা চালালে সরকার সমর্থকেরা চলে যায়।
মামলার রায় ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আলিয়া মাদরাসার আশপাশের সব রাস্তা, অলিগলিতে যানবাহন প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। আলিয়া মাদরাসার দিকে সব রাস্তার প্রবেশ পথে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। সকাল থেকেই বিপুল বিএনপি সমর্থক আইনজীবী এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত হন আলিয়া মাদরাসার মাঠে নবকুমার ইনস্টিটিউশন ও ড. শহীদল্লুাহ কলেজের সামনের রাস্তার প্রবেশ পথে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মাত্র চারজন সিনিয়র নেতাকে আদালত কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। আদালত কক্ষে বিপুল পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন উপস্থিত ছিলেন। পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে নারী পুলিশ উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১০০। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। আদালতের বাইরে মাঠে শত শত পুলিশ, র্যা ব, ডিবি সারিবদ্ধভাবে দÐায়
মগবাজার থেকে বকশীবাজার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। কোনো কোনো এলাকায় পুলিশের সাথে বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের। আবার কোনো কোনো এলাকায় পুলিশের সাথে এ সংঘর্ষ হয়।
মগবাজারে পুলিশের বাধা
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহর মগবাজার মোড়ে পৌঁছার আগেই চারদিক দিয়ে সেখানে যুক্ত হন বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী। এ সময় গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ নেতাকর্মীদের বাধা দিলেও তারা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে বেগম জিয়ার গাড়িবহরে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকে খালেদার জিয়ার গাড়িবহর। বেলা ১২টা ৩৭ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে এলে হলি ফ্যামিলির সামনের সড়কে ধাওয়া দেয় সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। তারা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। এ সময় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের কর্মীরা পাল্টা ধাওয়া দেয়। এতে পিছু হটে সরকারদলের নেতাকর্মীরা। এখানে প্রায় ১০ মিনিট দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলে। এ সময় একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। ১২টা ৪৫ মিনিটে গাড়িবহর হলি ফ্যামিলি অতিক্রম করলে বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে ফের মিছিল নিয়ে সামনের দিকে আসতে থাকে সরকার সমর্থকেরা। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা ফের ধাওয়া দেয়। এ সময় সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইটপাটকেলের আঘাতে এ সময় কয়েকজন আহত হন। এরই মধ্যে এগিয়ে যায় খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। বেলা ১টা ৭ মিনিটে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে দিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর মৎস্য ভবনের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় কাকরাইল মোড় থেকে মৎস্য ভবন মোড়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর আসার আগেই বহরের অগ্রবর্তী বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ পাল্টা জবাবে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে নেতাকর্মীরা। এ সময় দুইটি মোটরসাইকেলে আগুন ও একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া কাকরাইল মসজিদের সামনে একটি ট্রাফিক পুলিশের বক্স ভাঙচুর করা হয়। খবর পেয়ে মৎস্য ভবন পর্যন্ত আসা নেতাকর্মীরা ফের কাকরাইল মসজিদের সামনে আসেন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। একপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের চাপে পুলিশ নীরব ভূমিকা নেয়। ততক্ষণে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর মৎস্য ভবন মোড় পার হয়ে যায়।


উদ্বেগ আর আতঙ্কে মোড়া পুরো দেশ। কী হবে, কী হচ্ছে- এমন প্রশ্ন ছিল সবার মুখে মুখে। খালেদা জিয়ার সাজা ঘোষণার পর মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যায়। আগের দিন রাত থেকে সারা দেশে আরোপ করা নিরাপত্তা কড়াকড়িতে ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়ক অনেকটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজনে যারা ঘর থেকে বের হয়েছেন তাদের দফায় দফায় তল্লাশিতে পড়তে হয়।
মোড়ে মোড়ে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছে রাজধানীবাসী। একেবারেই হাতেগোনা গণপরিবহন চলেছে সড়কে। পাঠাও ও বাহনের মতো অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধের নোটিশ আগেই গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল। ফলে রায় ঘিরে উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় নামা অফিসগামী যাত্রী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে থমথমে অবস্থা বিরাজ করেছে পুরো দেশজুড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করেছে আতঙ্ক। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে ঢাকামুখী দূরপাল্লার যানবাহন। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে পুলিশ। চেকপোস্ট ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে যাত্রীদের তল্লাশি করতে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সকাল থেকে বিজিবি, র্যা ব ও পুলিশের টহল শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অন্যান্য দিনের তুলনায় কম যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। মালামাল নিয়ে নারী-পুরুষ-শিশু যাত্রীদের বিভিন্ন বাস কাউন্টারগুলোর সামনে ভিড় দেখা যায়।
রণক্ষেত্র সিলেট
সিলেটে সংঘর্ষ চলাকালে অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ ক্যাডার রায় ঘোষণার পরপরই বৃহস্পতিবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সিলেট। নগরীর কোর্ট পয়েন্ট, সিটি পয়েন্ট, জেলা পরিষদের সামনে, সুরমা মার্কেট ও জিন্দাবাজারে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় এ সংঘর্ষে অংশ নেয় বিএনপি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতেও মহড়া দিয়েছে কর্মীরা। এতে অন্তত ৫ জন গুলিবিদ্ধ সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামে ডা. শাহদাতসহ আটক ২০
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা.শাহাদাত হোসেনসহ ২০ জনেরও বেশি নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে নগর বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবন থেকে তাদের আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। এর আগে সকাল ৯টা থেকে শত শত পুলিশ সদস্য দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবন ঘেরাও করে রাখে। ফলে অনেক চেষ্টা করেও দলের নেতাকর্মীরা কার্যালয় থেকে বের হতে পারেননি। নেতাকর্মীরা যতবারই কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন ততবারই পুলিশ লাঠিচার্জ করে ধাওয়া দিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন।
৯টার পর থেকে পুলিশ দলীয় কার্যালয় ঘেরাও করে রাখে। এ সময় একাধিকবার চেষ্টা করেও বিএনপি নেতারা কার্যালয় থেকে বের হতে পারেননি। একপর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে মহিলা দলের নেতাকর্মীরা কার্যালয় থেকে বের হলে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ ও মারধর করে। এ সময় নগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন তাদের রক্ষায় এগিয়ে গেলে পুলিশ তাকে আটক করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here