দিনে দিনে সংস্কৃতির শহর হয়ে উঠছে ঢাকা

0
293
রাজধানী ঢাকা কী দিনে দিনে সংস্কৃতির শহর হয়ে উঠছে! নগরজুড়ে জমজমাট অনুষ্ঠান মঞ্চগুলো যেন সেই কথাই বলে। সারাবছরই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে সরগরম সংস্কৃতি অঙ্গন। শীতকালের শুরুতে তার ব্যাপ্তি যায় বেড়ে। এর পাশাপাশি বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীত উত্সব ও আন্তর্জাতিক লোক সংগীত উত্সব, আন্তর্জাতিক সাহিত্য উত্সব, শিশু চলচ্চিত্র উত্সব ইত্যাদি আয়োজন সাংস্কৃতিক উত্সবে আন্তর্জাতিক আমেজ নিয়ে উপস্থিত হয় দর্শক-শ্রোতার সামনে। চাকরির জন্য ছুটোছুটি, ব্যবসা, যানজট—এই কংক্রিটের নগরীতে মানুষের জীবনকে যখন একঘেয়ে ও যান্ত্রিক করে তোলে তখন এসব উত্সব যেন মরুভূমির বুকে সবুজ মরুদ্যান হয়ে হাজির হয় মানুষের সামনে। তাহলে কী নতুন পরিচয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে রাজধানী! তবে এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড রাজধানীকেন্দি ক হয়ে উঠছে কিনা এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, শুধু অনুষ্ঠান করা নয় এসব আয়োজন বৃহত্তর পরিমণ্ডলে মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে। সেখানেই এর পূর্ণতা।
এখন কত রকমের অনুষ্ঠানই না হচ্ছে শহরজুড়ে। এই তো ক’দিন আগেই ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে শেষ হলো বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীত উত্সবের ষষ্ঠ আসর। শিল্পকলা একাডেমিতে চলছে যন্ত্র সংগীত উত্সব। সারাদেশ থেকে বাজিয়েরা এসে সমবেত হয়েছেন ঢাকায়। এমনি করেই শিল্পকলা একাডেমির প্রতিটি মঞ্চে শুধু মঞ্চনাটক পরিবেশনাই নয়, একের পর এক আয়োজন করা হয় নানামাত্রার উত্সব। এসবের মধ্যে রয়েছে যাত্রা উত্সব, নাট্য উত্সব, নৃত্য উত্সব, নৃত্যনাট্য উত্সব ইত্যাদি। এর বাইরেও পৌষ মেলা, বর্ষাবন্দনা, শরত্ উত্সব, হেমন্তে নবান্ন উদযাপনসহ ঋতুভিত্তিক উত্সবগুলোও গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে শহুরে জীবনে ঠাঁই করে নিয়েছে।
সম্প্রতি এক বক্তৃতায় ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে নয় এই কাজে সরকারকে সহযোগী হতে হবে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, বড় বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে কিন্তু সেগুলো বড় সাংস্কৃতিক অভিঘাত তৈরি করতে পারছে কি না সেটাও ভাবতে হবে। তিনি বলেন, তবে এটা ইতিবাচক। নতুন ধারা বইছে এতে সন্দেহ নেই। মানুষের কাছে সংস্কৃতির চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা তো বিশাল শহর। এ ধরনের আয়োজন কেন্দি কতা সৃষ্টি করছে কি না সেটাও তো ভাবতে হবে। তবে একে অগ্রগতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, শ্লাঘা অনুভব করলেও সেটা ভুল হবে। সব মানুষের জন্য একটা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। রাজধানীজুড়ে অন্তত ১০০টি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য এই আগ্রহটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমিকে কেন্দ  করে সারাদেশে সাংস্কৃতি জাগরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন শিল্পকলা যন্ত্র সংগীত উত্সব চলছে। এতে সারাদেশের ১২শ যন্ত্রশিল্পী অংশ নিয়েছে। এমনিভাবে ঢাকার বাইরে সাংস্কৃতিক আয়োজন হচ্ছে। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক নাট্য উত্সব করা হচ্ছে ৬৪ জেলায়। সাহিত্যনির্ভর নাটক, মূল্যবোধের নাটক, মুক্তিযুদ্ধের নাটক উত্সব হচ্ছে। এর পাশাপাশি শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে সারাদেশে চারটি উত্সবের আয়োজন করেছি আমরা। এসব কিছুই আমরা করছি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দেশের মানুষকে যুক্ত করতে।
বাঙালি সংস্কৃতির মেগাসিটি :ঐতিহাসিক শহর ঢাকার পরিচয় নানা সময়ে ছিল নানা রকমের। তবে ঢাকা পরিপূর্ণভাবে একটি ‘সংস্কৃতির শহর’। এ শহরে নানা ধরনের আধুনিক অসামপ্রদায়িক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অনুষ্ঠান ও উত্সবের আয়োজন হচ্ছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এখানকার বাসিন্দাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটিকেও ফুটিয়ে তোলে। তাই অনেকের মতে, ঢাকা এখন ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ মেগাসিটি।
নগরজুড়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চাই :ঢাকা শহরে অসামপ্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত অবশ্যই বাংলা নববর্ষ উদযাপন। গত পাঁচ দশকে ছায়ানটের নববর্ষ উদযাপন রমনার বটমূল থেকে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ছায়ানট নিজেই একটি বড় মাপের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ  শতবর্ষ উদযাপনের পর এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন কয়েকজন তরুণ সাংস্কৃতিক কর্মী। সেই ছায়ানট ধীরে ধীরে মহীরূহে পরিণত হয়েছে। তারা রবীন্দ  নজরুল উত্সবের পাশাপাশি উদযাপন করে দেশঘরের গান, শুদ্ধসংগীত উত্সব প্রভৃতি। বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ অনেক সাংস্কৃতিক রীতির প্রচলন ও জনপ্রিয়তা ঢাকার এক অসাধারণ রূপ তুলে ধরে। এটি ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর মর্যাদা পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রধান আয়োজক, তবে এখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তথা অন্যান্য শিক্ষালয়েও এটি আয়োজিত হচ্ছে, এমনকি এ প্রসঙ্গে সরকারি নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য উত্সব পালনের স্বতঃস্ফূর্ততাই এর মূল শক্তি।
এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, উত্সব গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সেগুলো মিডিয়ায় আসে না। ঢাকাতেও অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে। কর্মকাণ্ড ভালো। কিন্তু সব উত্সবকে ইতিবাচক ধরা ঠিক হবে না। অনেক উত্সব হচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশে কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য। অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকলেও তাদের অনুষ্ঠান করবার জায়গা শিল্পকলা, টিএসসি নয়তো পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানকার দর্শকরাও নির্দিষ্ট। কিন্তু রাজধানীর ব্যাপ্তি অনেক। অনেক মানুষের বাস। এই সব মানুষের কাছে পৌঁছানোর মতো অবকাঠামোগত সুবিধা এখানে নেই। মিরপুরে ৫০ লাখ মানুষের বাস। কিন্তু একটি মিলনায়তনও সেখানে নেই।
এ প্রেক্ষিতে, পুরো রাজধানীজুড়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলবার কথা বলছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। মফিদুল হক বলেন, ধানমন্ডির রবীন্দ  সরোবরটাকে রেস্টুরেন্ট আর খাবারের দোকানগুলো গিলে ফেলেছে। অথচ এটা খুব সুন্দর সাংস্কৃতিক কেন্দে  রূপান্তর করা যেত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here