মন্ত্রীরাও চোর,আমিও চোর

0
155

কামরুল ইসলাম খান: শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কি সত্যি কথাই বলে ফেললেন? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক শ্রেনীর নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ জোরদার। বিদেশে লাখ লাখ কোটি ডলার পাচারের অভিযোগও জোরদার হয়েছে, সেই সাথে টেন্ডার থেকে শুরু করে দূর্নীতির নানা অভিযোগ। এবার সয়ং শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছেন, শুধু কর্মকর্তারাই ঘুষ খান না, মন্ত্রীরাও দুর্নীতি করেন। মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর।

ঘুষ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি জাগরণে রুপান্তর হয়েছে। স্যোসাল মিডিয়ায় ঝড় বইছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ দুর্নীতি নিয়ে এভাবে সরল সাধারণ স্বীকারোক্তি এর আগে কেউ আর দেননি। নুরুল ইসলাম নাহিদ তার বক্তব্যটি পরে কিছুটা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সব দেীষ চাপিয়েছেন সাংবাদিকদের ওপর। তরে তার ব্কব্যের ভিডিও হয়েছে ভাইরাল। তবে তার কয়েকদিন আগে গণশিক্ষা মন্ত্রী লুটপাট নিয়ে আরেকটি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ওই বক্তব্যটি একেবারে সরল স্বীকারোক্তি বলা যায় না। কারণ, তিনি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করার একপর্যায়ে নিজেদের দলীয় লুটপাটের বিষয়টি উত্তেজনার মধ্যে স্বীকার করেন।
শুধু কর্মকর্তারাই ঘুষ খান না, মন্ত্রীরাও দুর্নীতি করেন। মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর। এ কথা বলার সাথে সাথে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন যাতে তারা সহনশীল হয়ে ঘুষ খান। তবে এই সহনশীল পর্যায়টি কতটুকু তিনি তা বলেন নি। রাজধানীর শিক্ষা ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি পরে তার এ বক্তব্য অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায়।
ঘুষ-দুর্নীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, খালি যে অফিসাররা চোর তা না, মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। এ জগতে এমনই চলে আসছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। তাই আপনাদের অনুরোধ করেছি, আপনারা ঘুষ খান, কিন্তু সহনশীল হয়ে খান। কেননা, আমার সাহসই নেই বলার যে, ঘুষ খাবেন না। তা অর্থহীন হবে।’
মন্ত্রীর এ বক্তব্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সরাসরি প্রচার করা হয়। মন্ত্রী পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানের দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাইভ হয়। এর বড় অংশজুড়ে ছিল মন্ত্রীর বক্তব্য।
দুর্নীতির বিষয় উল্লখ করে মন্ত্রী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা স্কুলে যান খাম রেডি থাকে। সেটি নিয়ে আসেন আর পজিটিভ রিপোর্ট দেন। এটার পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে একজন কর্মকর্তাকে দুদক দিয়ে ধরিয়েছি। কারণ থানা পুলিশ দিয়ে ধরালে ঘুষ খেয়ে তারাও ছেড়ে দিবে। বাধ্য হয়ে দুদককে দিয়ে ধরাতে হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ওই কর্মকর্তার তথ্য সংগ্রহ করে দেখলাম উনি ৫টি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবার এক মাসের বেতন দিতে বলেন। সেই অনুযায়ী শিক্ষকরা টাকা রেডি করে। অনেক কষ্টে তাকে ধরতে হয়েছে। ঢাকায় যখন তাকে ধরা হয়, তখনও তার সঙ্গে আড়াই লাখ টাকা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, এখন এক মাসের বেতন মানে অনেক টাকা। কারণ শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। তাই এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। ওই দপ্তরের চাকরি করে একজন ঢাকায় তেরটি বাড়ি করেছে তথ্য দিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি অবশ্য চালাক লোক। এক জায়গায় কেনেননি। একেক জায়গায় জমি কিনে ধীরে ধীরে এই বাড়িগুলো করেছেন। তিনি বলেন, অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে।
চোরের নৌকার মাঝি প্রধানমন্ত্রী: বি চৌধুরী
এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চোরের নৌকার মাঝি আখ্যা দিয়েছেন নতুন রাজনৈতিক জোট যুক্তফ্রন্টের আহ্য়বাক অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ঘুষ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সোমবার বিকেলে শহীদ মিনারে অনশনরত প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দেখতে গিয়েতিনি এমন মন্তব্য করেন।
বিকল্পধারার সভাপতি বি চৌধুরী বলেন, ‘চোরের নৌকার মাঝি হচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ যে মন্ত্রীরা দুর্নীতিকে সমর্থন করে, তাদের নেতা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তার উচিত শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া। কারণ ঘুষ নিতে মানা করার দুঃসাহস উনার (শিক্ষামন্ত্রী) নেই। মানে তিনি তা সমর্থন করেন। এই দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীরা আপনাকে চোরের নৌকার মাঝি বানিয়েছে।’
সরকার আত্মস্বীকৃত চোর ও দুর্নীতিবাজ : রুহুল কবির রিজভী
শিক্ষামন্ত্রীর ঘুষ নেওয়ার কথাতেই প্রমাণ হয় যে বর্তমান সরকার আত্মস্বীকৃত চোর ও দুর্নীতিবাজ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, সহনীয় মাত্রায় ঘুষ নিতে বলে দেশের শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠিয়েছেন। দেশের শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য যদি এটাই হয়, তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সততা-নৈতিকতার পাঠ কোথা থেকে নেবে? সোমবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, তাঁর (শিক্ষামন্ত্রীর) কথায় মনে হয়-সৃজনশীল, সৌম্য, সুশিক্ষিত মানুষ হওয়ার বদলে ছাত্ররা বখাটে হোক। তাঁর এই বক্তব্যে আরো প্রতীয়মান হয় যে, তিনি চাচ্ছেন-ছাত্র-ছাত্রীদেরকে জ্ঞানদীপ্ত প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আদর্শ জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ না হয়ে বরং দুর্নীতি, দখলবাজী, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, দলবাজী, দুর্বৃত্তপনা, ইভটিজিং, মাদকসহ লুটপাট করার অর্থবিত্তের কাছে নতি স্বীকার করতে শিখুক। শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যে জাতির হৃদয়ের স্পন্দনকে থামিয়ে দেয়ার সামিল। দেশে বিদ্যমান নৈরাজ্যকর অমানিষার মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য দেশের জন্য আরো ভয়াবহ উদ্বেগ, ভয় ও বিপদের কারণ হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে প্রমাণিত হলো-বর্তমান সরকার আত্মস্বীকৃত চোর ও দুর্নীতিবাজ। দেশে যে জঙ্গলের রাজত্ব চলছে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে সেটিরই বহি:প্রকাশ
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি টিআইবি’র
এদিকে ‘সহনশীল’ মাত্রায় ঘুষ গ্রহণের পরামর্শ প্রদান ও ঘুষ গ্রহণে বাধা দেয়ার সাহস নেই বলে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একজন মন্ত্রী নিজেকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে ঘোষণা দেয়া সাহসিকতার পরিচায়ক হতে পারে; তবে একই সঙ্গে এই সৎসাহসের যথার্থতার স্বার্থেই নৈতিক অবস্থান থেকে তিনি পদত্যাগ করে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন- এই প্রত্যাশা করছে টিআইবি।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য যেমন জাতির জন্য উদ্বেগজনক, তেমনি এতে কেবল তার নিজের বিভ্রান্তি ও হতাশার প্রতিফলন ঘটেছে। মন্ত্রীর বক্তব্যে এটাও পরিষ্কার যে, ইতিপূর্বে শিক্ষা খাতে টিআইবি’র একাধিক গবেষণায় উঠে আসা ব্যাপক মাত্রার দুর্নীতির চিত্র ও বিশ্লেষণকে তিনি শুধু ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার ও উপেক্ষাই করেননি, বরং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রশ্র্রয় ও সুরক্ষা দিয়েছেন, যার ফলে তাকে এখন নিজেকে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের হাতে জিম্মি ভাবতে হচ্ছে। তার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সৎসাহস ও দৃঢ়তা থাকত তাহলে এরূপ অসহায়ত্বের মাধ্যমে দুর্নীতির আরো বিস্তার ঘটানোর প্রেসক্রিপশন দেয়ার প্রয়োজন ছিল না। সেক্ষেত্রে তিনি তার দাবি অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার কার্যকর প্রয়োগ করতে পারতেন।
সিপিবি ননসেন্স: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কিছুই করে না। তারা ননসেন্স। বুধবার সচিবালয়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে সিপিবি’র বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। এসময় অর্থমন্ত্রী টানা আট বছর দায়িত্বে থেকেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা আছে, দ্যাটস অল। কিন্তু তাদের (সিপিবি) তো অ্যাসিসটেন্স নেই। তারা ননসেন্স। তারা কিছুই করে না। দুই চারজন নেতা আছে, তাদের তো বাঁচতে হয়। বাঁচার জন্যই এগুলো করে তারা।
নাহিদের ব্যাখ্যা: অতীতের উদাহরণ তুলে ধরতে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম
এদিকে ঘুষ নিয়ে দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেছেন, রোববার পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অনুষ্ঠানে দেয়া তার বক্তব্য কিছু গণমাধ্যমে খÐিতভাবে আসায় বিভ্রান্তির তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের দুর্নীতি দুঃশাসনের আমলকে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, ওই সময়ে দুর্নীতির পরিবেশ বোঝাতে ‘মন্ত্রীরা চোর’ বলেছিলাম। সংবাদ সম্মেলনে দুই পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পাঠের পর সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি মন্ত্রী। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে তিনি লিখিত বক্তব্যের বাইরে কোনো কথা বলবেন না বলে জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here