মধ্যপ্রাচ্যে নারীকর্মী নির্যাতনের নেপথ্যে 

0
205

 

রোকনুজ্জামান পিয়াস: গৃহকর্তা খারাপ লোক, যৌন নির্যাতনকারী, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কাজ করায়  , ঠিকমতো বেতন দেয় না, প্রায়ই মারধর করে, খেতে দেয় না। এতে করে অসুস্থ হয়ে পড়ে তারা। এ ধরনের অভিযোগ আসছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যাওয়া নারীকর্মীর পরিবারের পক্ষ থেকে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অভিবাসীকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনে প্রতিদিনই এসব অভিযোগ পড়ছে। এসব নির্যাতনের শিকার হয়ে সংশ্লিষ্ট নারী কর্মীরা কেউ গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, কেউ নিখোঁজ রয়েছে দিনের পর দিন। আবার কেউ মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে কাজ করে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসিভুক্ত দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব-আমিরাত ও ওমানে।

গৃহকর্মীর কাজ দিয়ে সেসব দেশে পাঠালেও নির্যাতিত নারীদের অভিযোগ, তাদের সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। ফলে তাদের কাজের যেমন পরিসীমা থাকে না, তেমনি নানা ধরনের বাজে আচরণের শিকার হতে হয় তাদের। এসব কারণে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং নেপাল মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে তাদের নারীকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। আর এই সুযোগে বাড়ছে বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মী পাঠানোর হার। যদিও নির্যাতন থেকে রক্ষায় সরকারের কার্যকর কোন ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। সম্প্রতি ওই সব দেশের গৃহকর্মীদের অবস্থা, তাদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনি কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভাস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন। গত ৩১শে জুলাই মিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ হোসেন সরকার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে গৃহকর্মীর অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন আইনের প্রয়োজনীয়তা ও ওই সব দেশের বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশে বিদ্যমান দুর্বল আইনি কাঠামো এবং তাদের গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী কর্মীরা।

জানা যায়, সাম্প্রতিককালে জিসিসিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ ও অন্যান্য কয়েকটি দেশে নারীকর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এসব দেশে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও নেপাল নারীকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশি নারীকর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে নারীকর্মী গেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন। এই কর্মীদের ৭৮ ভাগই গেছে জিসিসিভুক্ত দেশে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য দেশে কর্মরত কর্মীদের তুলনায় গৃহকর্মে নিযুক্ত কর্মীরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তাদেরকে বেশি সময় কাজ করতে হয়, অন্যদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক দেয়া হয় এবং সবচেয়ে বেশি মানসিক পীড়ন ও ঝুঁকিতে থাকেন। এ ধরনের বৈষম্য থেকে গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বেশকিছু আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। ২০১১ সালে আইএলও শুধুমাত্র গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় গৃহকর্মী সনদ-২০১১ প্রণয়ন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং নারী গৃহকর্মী গ্রহণকারী প্রায় কোনো  দেশই এই সনদ অনুসমর্থন করেনি। ওইসব দেশ তাদের শ্রম আইনেও গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করেনি।

জেনেভাস্থ শ্রম কল্যাণ উইংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব ১৯৬২ সালে রয়াল ডিক্রির মাধ্যমে দাসপ্রথা বাতিল করলেও গৃহকর্মে নিযুক্ত কর্মীর বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ করেনি। সৌদি আরবে কর্মরত গৃহকর্মীদের সপ্তাহে ৬৩.৭ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, যা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। শ্রম আইনে কর্মীদের ৮ কর্মঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও গৃহকর্মীদের বেলায় তা ১৫ ঘণ্টা। তাছাড়া ৯ ঘণ্টা সময় গৃহকর্মীরা নিজের মতো করে বিশ্রাম বা অবসর সময় পারেন কিনা তার নিশ্চয়তা বিধানে পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কাতারে কর্মরত গৃহকর্মীরা অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় প্রায় ৩০ ভাগ কম পারিশ্রমিক পান। শ্রম আইনের পরিধিভুক্ত না রাখার কারণে তারা শ্র্রম আদালতে বা লেবার মিনিস্ট্রিতে অভিযোগ দিতে পারেন না। কুয়েতে শ্রম আইন বা প্রাইভেট সেক্টর লেবার ল-২০১০ এ গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০১৫ সালের গৃহকর্মী আইনে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার কথা উল্লেখ নেই। বাৎসরিক ছুটির বিষয়ে বলা হলেও তার সময় কত হবে তা উল্লেখ নেই। বাহরাইনে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। সংযুক্ত আরব-আমিরাতে গৃহকর্মীদের জন্য প্রণীত ‘স্টান্ডার্ড কন্ট্রাক্টটি ২০১৪ সালে সংশোধন করা হয়। যাতে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এতে দৈনিক কর্মঘণ্টার কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাছাড়া ওভারটাইম বা গৃহকর্মীর পক্ষে কোনো  ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়নি। এ আইনে প্রকারান্তরে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানোকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহকর্মী চাকরির শুরুতেই প্রতারণার শিকার হন। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগে স্বাক্ষরিত কন্ট্রাক্টটি সংযুক্ত আরব-আমিরাতে যাওয়ার পর প্রতিস্থাপিত হয়, যাতে পারিশ্রমিকসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়া হয়। ওমানের শ্রম আইনে ন্যূনতম মজুরি সম্পর্কে বলা হয়নি। এতে কর্মীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি। দেশটির চাকরিদাতারা প্রায়ই কর্মীদের প্রাপ্য মজুরি দিতে গড়িমসি করে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। মাইগ্রেন্ট রাইটস্ ইউকের হিসাব অনুযায়ী ২০১৩ সালের প্রথম তিন মাসে গৃহকর্মীদের কাছ থেকে ২২৭৯টি অভিযোগ পাওয়া যায়, যার বেশির ভাগই গৃহকর্মীদের পারিশ্রমিক না দেয়া সংক্রান্ত। বিদ্যমান আইনে কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বাৎসরিক ছুটি, ওভারটাইম ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সব কটি দেশে কাফালা বা স্পন্সরশিপ বিদ্যমান থাকায় কোনো কর্মী মালিকের অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারে না। আইন থাক বা না থাক পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়োগকর্তার কাছে জমা থাকে। কোনোভাবে বাইরে গেলেই পলাতক হিসেবে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে। এতে অন্য কোথাও তার কাজের সুযোগ থাকে না। ফলে যত প্রকার নির্যাতনই হোক তাদের চাকরিদাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।

এসব দিক বিবেচনায় জিসিসিভুক্ত দেশে বিদ্যমান আইনি কাঠামো গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেছে জেনেভাস্থ বাংলাদেশ মিশনের প্রতিবেদনটি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বরাবর পাঠানো ওই প্রতিবেদনে এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়। এগুলো হলো- গৃহকর্মী সনদ-২০১১ এবং গৃহকর্মী সুপারিশমালা-২০১১ অনুসরণে অভিবাসন প্রত্যাশী গৃহকর্মী এবং গৃহকর্তার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে চাকরির সকল শর্তাদি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা। পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো  কাগজ আটকে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কাফেলা বা স্পন্সরশিপ ব্যবস্থা রহিতকরণে চাপ অব্যাহত রাখা। নারী কর্মীদেরকে ওইসব দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনের পরিধিভুক্তকরণে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখা। গৃহকর্তার বাড়ির বাইরে গৃহকর্মীর আবাসস্থলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উপায় ও কৌশল নির্ধারণ করা। কর্মী গ্রহণকারী বিশেষ করে গৃহকর্মী গ্রহণকারী যে সকল দেশের সঙ্গে কোনো প্রকার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি নেই, সে সকল দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বা চুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীকর্মী গ্রহণকারী মধ্যপ্রাচের দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, দরকষাকষি এবং চুক্তি সম্পাদনকালে বর্ণিত আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোসমূহ বিশেষত: গৃহকর্মী সনদ-২০১১ এর যথাযথ বিশ্লেষণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদÐ অনুযায়ী বাংলাদেশী গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা বিধান সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here