বিশ্বব্যপী সন্ত্রাস: নয়া বাস্তবতা 

0
256

 

জেফ্রি ট্রেইস্টম্যান

সোমবার সকালে নিউইয়র্কে বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় এক ব্যক্তি। টার্গেট ছিল টাইমস স্কয়ারের কাছে শহরের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের পথচারী চলাচলের স্থান। পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজনের নাম আকায়েদ উল্লাহ (২৭) বলা হচ্ছে, সে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। থাকতো ব্রæকলিনে। বিস্তারিত এখনো সামনে না এলেও, হামলার ধরন বর্তমান সময়ের সন্ত্রাসবাদের নতুনস্বাভাবিক চিত্রই তুলে ধরে।

গত কয়েক মাস ধরে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষজ্ঞরা যেসব সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন তার সঙ্গে হামলার সঙ্গতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে গণপরিবহনের কেন্দ্রস্থলগুলো নিয়ে সতর্কবাণী শুনিয়েছিলেন। আরো সতর্ক করেছিলেন যে, বৈশ্বিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ক্রমাগতলোন ওলফদের (স্বপ্রণোদিত হামলাকারী) ওপর নির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে যারা আলাদা আলাদা হামলা চালাবে। বিশেষ করে ছুটির মৌসুমগুলোতে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ছুটির সময়ে হামলা চালাতে আইএসের আহ্বান অনুসরণ করেছে। দৃশ্যত এটাই মনে হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, ক্রিস্টমাস বাজারগুলোতে আইএস যোগসূত্র থাকা হামলাগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে সে।

আধুনিককালের সন্ত্রাসবাদের নতুন এই চল মূলত বড় পরিসরের সন্ত্রাসী সংগঠনের ধারণা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। স্বপ্রণোদিত সদস্যদের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা বাড়ছে। সত্যি বলতে গেলে, এই পরিবর্তন হলো আইএসের মতো বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের উৎখাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। 

ফলে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো তাদের সংগঠনের পক্ষে একজন লোন ওলফ সদস্যের চালানো হামলার ওপর ক্রমাগত নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার টেরোরিজম বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কও একপ্রকার একমত পোষণ করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, লোন ওলফ অনুসারীদের প্রতি আইএসের জেগে ওঠার আহ্বান এবং নিজ নিজ দেশে হামলা চালানোর তাগাদা হলোপরিবেশ আরো কঠিন হয়ে ওঠার স্বীকৃতি আপাতদৃষ্টিতে, বড় আকারের আমলাতান্ত্রিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া সন্ত্রাসবিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, এটা নানা ধরনের নতুন কঠিনতর চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। 

ছোট আকারের গ্রুপগুলো গড়ে তোলা সহজতর এবং এদের মোকাবিলা করা অপেক্ষাকৃত কঠিন। এমন ক্ষেত্রে নজরদারি অনেক সময় অকার্যকর। কেননা, কেন্দ্রীয় কোনো হুকুমদাতার সঙ্গে এসব ব্যক্তিবিশেষের যোগাযোগ করার সম্ভাবনা কম। ছোট আকারের হামলা চালাতে আর্থিক সহায়তা অবশ্য প্রয়োজনীয় নয়। আর সন্ত্রাসীদের এখন আর ব্যাপক প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। কেননা, বোমা তৈরির মতো কারিগরি তথ্যের বিরাট ভাÐার ইন্টারনেটে সহজেই পাওয়া যায়।

নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো সন্ত্রাসসম্বন্ধীয় তথ্যউপাত্তের সহজলভ্যতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যে কেউ ইন্টারনেটে গিয়ে আজেবাজে, জঞ্জাল যা খুশি ডাউনলোড করতে পারে আর ঘরে বসে বোমা তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতা নিয়ে আমরা বাস করছি।

যাই হোক, নিউ ইয়র্কের এই হামলা এবং গেল অক্টোবরে ডাউনটাউন ম্যানহাটনে হওয়া ট্রাক হামলা ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সন্ত্রাসবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির অকার্যকরতাও তুলে ধরে বটে। বিশেষ করে, দুটো হামলারই সন্দেহভাজনদের জন্মসূত্রের দেশ প্রেসিডেন্টের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত নয়। এসবের পরিবর্তে সন্ত্রাসবিরোধী নীতির লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সামর্থ্য জোরদার করা। সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা শনাক্ত করা এবং তা মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাদের শক্তিশালী করে তোলা। ধরনের ঘটনায় সামরিক বাহিনী নয় স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা সবার আগে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে সেটাই স্বাভাবিক। একারণে তাদের কার্যকর হওয়ার স্বার্থে যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং রিসোর্সেস থাকা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এমন কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রেল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অ্যামট্র্যাকের পুলিশ লেবার কমিটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড পার্লসন সম্প্রতি প্রকাশ করেন যে, সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় অ্যামট্রাক পুলিশ। আর বাহিনীর জন্য সরঞ্জাম আধুনিকীকরণ সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল অনেক আগে। এখনও তেমনটা হয় নি। সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে আন্তঃসংস্থা সহযোগিতার গুরুত্ব স্বীকার করে পার্লসন জানালেন যে, সর্বশেষ আন্তঃসংস্থা প্রশিক্ষণ তারা করেছিলেন ১০ বছর আগে।  

সফল সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতায় আরো প্রয়োজন তথ্যের কার্যকর আদানপ্রদান। কাউন্টার টেরোরিজম বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ক ন্যাথান সেলস মনে করেন, বার্সেলোনা নিস শহরের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলাগুলো আরো শক্তিশালী তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা দিয়ে হয়তো প্রতিরোধ করা যেত। কিন্তু তথ্য আদানপ্রদানের জন্য কার্যকর আইনি ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। গত বছর বার্লিন ক্রিস্টমাস বাজারে হওয়া হামলা থেকে আমরা অন্যতম কষ্টের যে শিক্ষাটা পেয়েছি তা হলো, অভিবাসী ফেরত পাঠাতে আইনি প্রতিবন্ধকতা না থাকলে ওই হামলা প্রতিহত করা যেতো।

বহু বিশেষজ্ঞ এখন মনে করেন, সামরিক সমাধান সন্ত্রাসবাদকে আরো উস্কে দিতে পারে। সম্ভাব্য বা পুরনো সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা এখন ডি্যাডিকালাইজেশন (উগ্রপন্থি আদর্শ থেকে ফিরিয়ে আনা) কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকছেন। পুরনো অপরাধী বা গ্যাং মেম্বারদের পুনর্বাসনের জন্য বিদ্যমান উদ্যোগগুলোর ওপর ভিত্তি করে এমন অনেকগুলো কার্যক্রম চলছে। ওদিকে, সিরিয়া যাওয়া বিদেশি যোদ্ধাদের উগ্রপন্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে জার্মানির প্রচেষ্টা, নিউনাৎসীদের অঙ্গীভূতকরণে দেশটির অতীত সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে। এমন কার্যক্রমের ফলপ্রসূতা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। কিন্তু, আপাতত যতটা তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে তাতে ইতিবাচক ইঙ্গিতই মেলে। এসব সত্তে¡ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আধুনিককালের সন্ত্রাসবাদের নতুন এইস্বাভাবিক রূপ প্রতিহত করা এবং বন্ধ করা কঠিন হবে।

স্বনামধন্য সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল বাইম্যান মনে করেন, অতীত অভিজ্ঞতা থাকলেও ছোট আকারের সন্ত্রাসী হামলার অনেকগুলোই প্রতিহত করা কঠিন হবে। এতে করে, ফার্স্ট রেসপন্ডারদের সামর্থ্য বৃদ্ধি করা এবং সম্ভাব্য দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে আইনি বাধা সরানোর গুরুত্বই আরো জোরালো হয়। কার্যকর সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতার আংশিক অর্থ হলো, জাতীয় নিরাপত্তার সামরিক অঙ্গের ওপর নির্ভরতা থেকে সরে আসা এবং বিকল্প নীতির অন্বেষণ করা। ঠিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যেভাবেলোন ওলফ হামলার দিকে সরে গেছে। সোমবার যেমনটা ঘটেছে নিউ ইয়র্ক শহরে।

[জেফ্রি ট্রেইস্টম্যান পিএইচডি ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক। অতীতে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ইরাকের বাগদাদে পলিসি অ্যাডভাইজরি হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকান কমান্ডের পরামর্শক ছিলেন তিনি। ওপরের লেখাটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম  ‘দ্য হিলে প্রকাশিতনিউ ইয়র্ক সিটি টেরর অ্যাটাক ইজ দ্য নিউ নরমাল শীর্ষক তার মতামত কলাম থেকে অনূদিত। অনুবাদ করেছেন হাসনাইন মেহেদী।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here