কে এই স্টিফেন প্যাডোক?

0
231

কনসার্টে গুলি ছোড়ার ঘটনার সন্দেহভাজন বন্দুকধারী স্টিফেন প্যাডক একজন অবসরপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক ছিলেন। তাঁর ভাই এরিক প্যাডক বলেছেন, পোকার বা তাস খেলতে খুব পছন্দ করতেন স্টিফেন। এর আগে কোনো সহিংস ঘটনায় স্টিফেন জড়িত ছিলেন না বলে তিনি দাবি করেছেন।
লাস ভেগাসে কনসার্টস্থলের পাশে থাকা মান্দালাই বে হোটেলের ৩২ তলা থেকে বন্দুকধারী স্টিফেন ওই উন্মুক্ত কনসার্টে গুলি ছোড়েন। পুলিশ হোটেলকক্ষে ঢোকার আগেই স্টিফেন আত্মহত্যা করেন। গত বৃহস্পতিবার থেকে এই হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। পুলিশ ওই কক্ষে ১০টি বন্দুক পেয়েছে। ৬৪ বছর বয়সী স্টিফেন নেভাদার মেসকিটের বাসিন্দা। পুলিশ সন্দেহভাজন আরও এক ব্যক্তিকে খুঁজছে।
এমন সহিংসতার ঘটনায় স্টিফেনের জড়িত থাকার খবরে স্রেফ স্তম্ভিত হয়ে গেছেন তাঁর ভাই এরিক প্যাডক। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সে এমন একজন মানুষ যে কিনা ভিডিও পোকার খেলতে পছন্দ করত, সাগরে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসত এবং বোরিতোস (মেক্সিকোর একটি বিশেষ খাবার) খেত। তার এমন কাজ করার কোনো কারণই নেই, কোনো যুক্তি নেই।’
এরিকের দাবি, তাঁর ভাইয়ের কোনো সামরিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। স্টিফেনের আরেক ভাই হলেন ব্রুস প্যাডক। তিনি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, নিজের মালিকানাধীন অ্যাপার্টমেন্টের মাধ্যমে বেশ রোজগার করেছিলেন স্টিফেন। তিনি ধনী ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ আরও জানিয়েছে, সম্প্রতি বেশ বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেছিলেন এই সন্দেহভাজন বন্দুকধারী। তবে জুয়ায় জিতে বা হেরে ওই অর্থ লেনদেন করা হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্টিফেনের উড়োজাহাজ চালানোর ও শিকার করার লাইসেন্স ছিল। তবে কোনো অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত থাকার রেকর্ড নেই। লাস ভেগাসের স্থানীয় পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এর আগে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় জড়িত ছিলেন তিনি, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে এক সরকারি কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, স্টিফেনের পরিবারে মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে। সেই কারণে তাঁরও এমন সমস্যা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লাস ভেগাসে আসার আগে অরল্যান্ডোতে থাকতেন স্টিফেন। স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল, তবে কোনো সন্তান ছিল না। ভাই এরিক প্যাডক বলেছেন, তাঁদের বাবা বেঞ্জামিন হসকিনস প্যাডক একজন ব্যাংক ডাকাত ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) দাগি অপরাধীদের তালিকায় তাঁর নাম ছিল।
এরিক বলেছেন, সর্বশেষ সপ্তাহখানেক আগে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে স্টিফেন যোগাযোগ করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড় ইরমা আঘাত হানার পর মায়ের বিষয়ে কথা বলেছিলেন তিনি। এ ছাড়া এক সপ্তাহ আগেও মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন স্টিফেন।
সোমবার নেভাদার মেসকিটে স্টিফেনের দোতলা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। তবে এ বিষয়ে মেসকিট পুলিশের মুখপাত্র কুইন অ্যাভারেট বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি।
এদিকে আইএসের সংবাদ সংস্থা আমাক নিউজের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ জানিয়েছে, লাস ভেগাসে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। আইএসের দাবি, হামলাকারী স্টিফেন প্যাডক একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম। তবে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবি আই) আইএসের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলছে, এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পর্ক নেই। স্টিফেনের ভাই এরিকও দাবি করেছেন, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর ভাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, স্টিফেন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালান। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অস্ত্র বৈধভাবে কেনা হয়েছিল। তবে এরিক সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর ভাইয়ের কাছে ছোটখাটো বন্দুক (হ্যান্ডগান) আছে বলে জানতেন। তবে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কখনো দেখেননি।
স্টিফেনের সাবেক প্রতিবেশী ডায়ানে ম্যাককে (৭৯)। তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, স্টিফেন খুবই অদ্ভুত প্রকৃতির ছিলেন। ডায়ানে বলেন, ‘সে সব সময় চুপচাপ থাকত, নিজেকে গুটিয়ে রাখত।’
ফিলিপাইনে কার একাউন্টে এক লাখ ডলার পাঠিয়েছিল লাস ভেগাসের ঘাতক!
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৫৮ জনকে হত্যাকারী স্টিফেন প্যাডোক ফিলিপাইনে তার গার্লফ্রেন্ডের দেশে এক লাখ ডলার স্থানান্তর করেছিলেন। তদন্তে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এরপর ওই হোটেলে তার কক্ষ ও ফ্লোরিডায় তার বাড়ি থেকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ করে। কিন্তু কিভাবে সে হোটেল কক্ষে এত অস্ত্র জমা করেছিল সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো উত্তর মেলে নি। এসব নিয়ে তদন্ত চলছে যুক্তরাষ্ট্রে। এরই মধ্যে পুলিশ দেখতে পেয়েছে, তার গার্লফ্রেন্ডের বাড়ি ফিলিপাইনে। সেকানকার একটি ব্যাংক একাউন্টে এক লাখ ডলার স্থানান্তর করেছে স্টিফেন প্যাডোক। সেই একাউন্টটি কার এ বিষয়ে মুখ খোলে নি পুলিশ। তবে তারা জানিয়েছে ওই অর্থ স্থানান্তর হয়েছে ফিলিপাইনের এনবিসি ব্যাংকে। স্টিফেন প্যাডোকের ফিলিপিনো ওই গার্লফ্রেন্ডের নাম মারিলো ড্যানলে (৬২)। প্যাডোক যখন ওই গণহত্যা চালায় তখন তিনি ছিলেন বিদেশে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি এফবি আইয়ের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার লাস ভেগাস শেরিফ জোসেফ লম্বারডো নিশ্চিত করে বলেছেন, এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ড্যানলে। সোমবার কর্তৃপক্ষ যখন জানতে পারে ড্যানলে লাস ভেগাসে নেই তখন তার সন্ধান শুরু হয়। তারা নিশ্চিত ছিলেন, এ সময়ে ড্যানলে টোকিও এবং ফিলিপাইন এই এলাকায় সফর করছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। তার কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য এরই মধ্যে পেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ড্যানলে পুলিশকে বলেছেন, তাদের দু’জনের সম্পর্ক শুরু হয় এ বছরের শুরুর দিকে। কিন্তু অনলাইন ডেইলি মেইল মঙ্গলবার এমন কিছু ছবি হাতে পেয়েছে যা এর উল্টো কথা বলে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের পারিবারিক একটি ছবিতে ফিলিপাইনে দেখা গেছে স্টিফেন প্যাডোক ও ড্যানলেকে। তাদেরকে ২০১৪ সালে হোটেলে ও নাইট ক্লাবে দেখা গেছে। প্রথম ছবিতে দেখা গেছে ২০১৩ সালে ম্যানিলায় সফরে গিয়েছিল স্টিফেন প্যাডোক। সে সময় ড্যানলের পরিবারের সঙ্গে এক খাবার টেবিলে হাস্যোজ্বল দেখা যায় তাদেরকে। তাদেরকে দেখা যায় স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ‘কামায়ান ডিনার’ করছেন। হাত দিয়ে খাওয়া হয় বলে এমন ভোজের নাম দেয়া হয়েছে কামায়া। ফিলিপিনো শব্দ কামায় অর্থ হাত। ওই অনুষ্ঠানে তাদেরকে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে হাত দিয়ে মাছ, শাকসবজি ও ভাগ খেতে দেখা যায়।
এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ড্যানলির বোন লিজা ওয়ারনার। তিনি বসবাস করেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। অনুষ্ঠান শেষে তিনি কামায়ান ব্লুস শিরোনাম ব্যবহার করে ফেসবুকে এ ছবি পোস্ট করেছিলেন। উল্লেখ্য, স্টিফেন প্যাডোকের গার্লফ্রেন্ড অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকও। ২০ বছর আগে তার প্রথম স্বামী মারা যান। তারপরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর তিনি বিয়ে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাসের বাসিন্দা গিয়ারি ড্যানলেকে। কিন্তু ২০১৩ সালের এপ্রিলে তারা আলাদা হয়ে যান। তার আগে এক সঙ্গে তারা ২২ বছর ঘর সংসার করেন। ওই এপ্রিলেই স্টিফেন প্যাডোককে ছবিতে দেখা যায় ম্যানিলায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here