লন্ডনে আগুন ॥ সেহরির জন্য বেঁচে গেল বহু প্রাণ

0
421

৫ বাংলাদেশীসহ নিহত ১৭

সাফির আলম: লন্ডনে বহুতল এপার্টমেন্ট ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশীসহ ১৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে -বৃটিশ-বাংলাদেশী একই পরিবারের ৫ জন নিহত হয়েছে। ঐ ভবনে বসবাসকারী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। আগুনে কমপক্ষে ৭৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২০ জনের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ বলছে বাড়িটির আগুন নিভে গেলেও সেখানে ভেতরে ঢুকে অভিযান চালাতে আরো কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তারপরেই এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে জান-মালের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে।
লন্ডন সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে শহরের পশ্চিম অঞ্চলের ল্যাটিমার রোড এলাকার গ্রেনফেল টাওয়ার নামে ওই ভবনে আগুন লাগে। আগুন লাগার সময় ২৪ তলার ওই আবাসিক ভবনের লোকজন ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। এতে বহু মানুষ ওই ভবনে আটকা পড়েন। আটকে পড়া মানুষসহ ভবনটি যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।
ভবনে ১২০টি আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবনটির ৪র্থ তলা থেকে গভীর রাতে আগুনের সূত্রপাত হয়। দ্রুত আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। এ সময় আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে অধিকাংশ লোকজন ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার খবরে তারা ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার জন্য দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। দরজার কড়া নেড়ে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় আগুন লাগার খবর দেন বাসিন্দারা। দ্রুত কিছু মানুষ নেমে আসতে সক্ষম হলেও অধিকাংশ লোকজন আটকা পড়েন। ডেইলি মেইলের খবরে বলা হয়েছে, আগুন লাগার পর অন্তত ৬০০ বাসিন্দা প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। মৃত্যু ও দগ্ধ হওয়া থেকে বাঁচতে বহু বাসিন্দা জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছেন। কেউ কেউ শিশু সন্তানদের ছুড়ে মেরেছেন। এ সময় চারদিকে শুধু আর্তনাদ ও বাঁচার আকুতি লক্ষ্য করা গেছে। ‘হেল্প হেল্প’ চিৎকারে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
৪০টি ফায়ার ইঞ্জিন নিয়ে প্রায় ২০০ দমকল কর্মী আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করেন। আগুন নেভাতে ৪০টি ফায়ার ইঞ্জিন পাঠানো হয়। চারদিক থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লন্ডন দমকল বাহিনীর কমিশনার ড্যানি কটন বলেন, এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। দমকল কর্মী হিসেবে আমার ২৯ বছরের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের ব্যাপক অগ্নিকা-ের ঘটনা আমি আর দেখিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ছবি ও ভিডিওতে নিচ থেকে পুরো ভবনটিই জ্বলতে দেখা যায়। বিবিসির একজন প্রতিবেদক ঘটনাস্থল থেকে জানিয়েছিলেন, জ্বলন্ত ভবনটি থেকে বিভিন্ন অংশ খুলে নিচে পড়ে। চ্যানেল ফোরের উপস্থাপক জর্জ ক্লার্ক বিবিসিকে বলেছেন, ভবনটি থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে দাঁড়ানো অবস্থাতেও তার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো ছাইয়ে ঢাকা পড়ে যাবেন। ক্লার্ক জানান, ভবনে আটকা পড়া একজনকে তিনি ওপর থেকে টর্চের আলো দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেও দেখেছেন।
ভবনটির চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধার কাজ ব্যাহত হয়। আগুন যতই ওপরের দিকে উঠছিল ততই কালো ধোঁয়া আর ছাই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্লাস্টিক পোড়া দুর্গন্ধ আর বিস্ফোরণের বিকট শব্দ তখন শুনতে আশপাশে থাকা লোকজন। ভবন থেকে লাফ দিয়ে পড়ে গুরুতর জখম হয়েছেন অনেকে। ৯ম তলা থেকে এক বাসিন্দা তার নবজাতককে নিচে জনতার উদ্দেশে ছুড়ে মারেন। শিশুটি প্রাণে রক্ষা পেলেও তার মায়ের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়নি। ভবনের ১১ তলা দিয়ে উদ্ধারকারী দল প্রবেশ করে আটক পড়া লোকদের বের করে আনেন। আগুন থেকে বাঁচতে ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন অনেকে। তাদের কেউ কেউ লাফিয়ে পড়েন।
বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে স্টুয়ার্ট কান্ডি জানান, এখনও হাসপাতালে ৩৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে এ পর্যন্ত ভবনটির কতজন বাসিন্দা নিখোঁজ রয়েছেন তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।
তিনি জানান, ভবনটিতে চলমান তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। এদিকে বুধবার অপর এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার কমিশনার ডেনি কটন বলেন, ভবনটিতে অনেক দিন ধরে অভিযান চালাতে হবে। ভবনের ভেতরের অভিযান চালাতে অগ্নিনির্বাপকদের পাঠানোর আগে স্নাইফার কুকুর পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশী একই পরিবারের ৫ জন নিহত
‘আগুন আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা সবাই এখন বাথরুমে। আমাদের বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের জন্য দোয়া করেন মৃত্যুটা যেন কষ্টের না হয়।’ লন্ডনে থাকা চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে মৃত্যুর মুখে দাড়িয়ে মুঠোফোনে সর্বশেষ এ কথাই বলেছিলেন কমর উদ্দিনের ছোট মেয়ে হুছনা আক্তার তানিয়া। বুধবার লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারের অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত হয়েছেন মৌলভীবাজারের এই পরিবারের ৫ সদস্য। তাদের বাড়ি সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের খৈসাউড়া গ্রামে।
হুছনা আক্তার তানিয়ার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল জুলাইয়ে। সব প্রস্তুতিও সমপন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু তার আগেই এই ট্রাজেডি। মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া হুছনা আক্তার তানিয়ার বিয়ের দিন ধার্য ছিল ২৯শে জুলাই। বর থাকে লন্ডনেই। বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা লন্ডনেই। এ নিয়ে চলছিল প্রস্তুতি। বিয়েতে দু’দেশের স্বজনদের মধ্যে আনন্দ উৎসবেরও কমতি ছিল না। বিয়ে উপলক্ষে দেশের বাড়িতেও চলছিল সংস্কার কাজ।

লন্ডনে আবারো সংবাদ শিরোনামে মুসলিমরা


লন্ডনে আবারো সংবাদ শিরোনাম সেখানকার মুসলিমরা। সন্ত্রাসী হামলার পর তারা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কারণে এর আগে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। এবার পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটনে গ্রেনফেল টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের পরও তারা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। তাদের দরজা খুলে দেন দুর্গত মানুষের সেবায়। আল মানার, দ্য মুসলিম কালচারাল হেরিটেজ সেন্টার এক বিবৃতিতে বলেছে, গ্রেনফেল টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে আক্রান্ত যে কারো জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয়া হয়েছে আল মানার মসজিদ ও সেন্টার। এখানে যেকোনো ধর্মের, যেকোনো বিশ্বাসের মানুষ এসে বিশ্রাম নিতে পারেন। ঘুমাতে পারেন। পানি পান করতে পারেন। খাবার খেতে পারেন। আল মানারের স্টাফ ও স্বেচ্ছাসেবকরা আক্রান্ত এলাকায় পানি, খেজুর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণ করছে।
আশপাশের সেন্ট ক্লিমেন্টস ও সেন্ট জেমস চার্চও খুলে দেয়া হয়। এগিয়ে আসে শিখ সম্প্রদায়ও।
সেহরির জন্য বেঁচে গেল বহু প্রাণ
লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় অনেকের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে ওই ভবনের মুসলিমরা। পবিত্র রমজান মাসে ভোররাতে সাহরি খাওয়ার জন্য উঠে তাঁরাই প্রথমে লক্ষ করেন যে গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুন লেগেছে।
ভবনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভবনটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও আগুন লাগলে যে সতর্কবার্তা বা সংকেত বাজে, তা তাঁরা শুনতে পাননি। তবে আশপাশের প্রতিবেশীরাই প্রথমে আগুন লাগার ঘটনাটা বুঝতে পারেন। আর যাঁরা প্রথমে বুঝতে পারেন, তাঁরা বেশির ভাগই মুসলমান। রোজা রাখার জন্যই তাঁরা শেষ রাতে সাহরি খেতে উঠেছিলেন এবং তখনই তাঁদের কেউ কেউ ওই ভবনটিতে ধোঁয়া দেখতে পান।
৩৩ বছর বয়সী আন্দ্রে বারোসো বলেন, ‘ওই ভবন থেকে অনেক মানুষকে বাইরে বেরিয়ে আনার জন্য বড় ভূমিকা পালন করেছেন মুসলমানেরা। আমি ওই সময় যাঁদের দেখতে পেয়েছি, তাঁরা অধিকাংশই মুসলমান। তাঁরা অন্যদের খাবার ও বস্ত্র সরবরাহ করেছেন।’
গ্রেনফেল টাওয়ারের কাছে অপর এক নারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখানে যদি মুসলিম ছেলেমেয়েরা এসে আমাদের সাহায্য না করতেন, তাহলে হয়তো আরও অনেক লোক মারা যেত। তারাই প্রথম মানুষ, যারা পানি সরবরাহ করেছে, মানুষকে সাহায্য করেছে এবং দৌড়ে গিয়ে মানুষকে বলেছে।’
গ্রেনফেল টাওয়ারের ১৮ তলায় থাকতেন খালিদ সুলেমান আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার কোনো সতর্কবার্তা বাজেনি। আমি প্লেস্টেশন খেলছিলাম আর খাবারের অপেক্ষা করছিলাম, তখনই ধোঁয়ার গন্ধ পাই। আমি উঠে ঘরের জানালা বন্ধ করে দিই, তখনই দেখি সপ্তম তলায় ধোঁয়া। আমি তখনই আমার আন্টিকে জাগিয়ে তুলি। এরপরে কাপড় পরে বাইরে গিয়ে প্রতিবেশীদের দরজায় ডাকাডাকি শুরু করি।’
ওই ভবনের অপর এক বাসিন্দা রাশিদা স্কাই নিউজ বলেন, ‘বেশির ভাগ মুসলমান এখন পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখছেন। তাঁরা সাহরি খাওয়ার জন্য সাধারণত রাত দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে ঘুম থেকে ওঠেন। খাওয়া শেষে তাঁরা ভোরে ফজরের নামাজ পড়েন। সুতরাং এখানে প্রায় বেশির ভাগ পরিবারই জেগে উঠে অন্যদের সাহায্য করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here