বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কোনদিকে মোড় নিচ্ছে 

0
303

সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লায় অভিযান ॥ র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২০ জন নিহত

 

খায়রুল আলম: বাংলাদেশে এক সপ্তাহের মধ্যে সিলেট, মৌলবভীবাজার ও কুমিল্লায় জঙ্গি বিরোধী অভিযানে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত: ২০ জন নিহত হয়েছে । নিহতদের মধ্যে মহিলা ও শিশুও রয়েছে। প্রায় পুরো সপ্তাহ ধরে সিলেটের  আতিয়া মহল, মৌলভীবাজারে দুটি বাড়িতে ও কুমিল্লায় নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি আটকে ছিল। সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমায় শিববাড়ি এলাকায় আতিয়া মহলেরর অভিযানে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ মাত্মক আহত হন। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তাঁর মৃত্যু হয়।

গত শনিবার সিলেটে জঙ্গি আস্তানার কাছে বোমা বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন আবুল কালাম আজাদ। চারদিন ধরে এ বাড়ির দিকে একটি পুরো সপ্তাহ ধরে দৃষ্টি ছিল সারা দেশের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে বাড়িটি ঘিরে রাখে। শনিবার সকালে আতিয়া মহলের জঙ্গি আস্তানায় মূল অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। ওই বাড়িতে আটকে পড়া সাধারণ মানুষদের উদ্ধার করা হয় নিরাপদে। অভিযান চলে তিন দিন। সোমবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযানে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে এক জন নারী।

তবে সিলেটের আতিয়া মহলের ঘটনায় ঘটে যায় আরো অনেক কিছু। বাড়ির বাইওে একটি বোমায় একটি বোমায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ছাত্রলীগ নেতাসহ নিহত হয় ৬ জন। গুরুতর আহত হন অভিয়ানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের প্রধানসহ আরো কয়েকজন। বোমাটি কোথা থেকে আসল সে প্রশ্নে নানা রকম তথ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, হামলা নয়, আগে থেকে পড়ে থাকা বোমা ধাক্কা লেগে বিস্ফোরিত হলেই সিলেটের শিববাড়িতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হন। র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধানসহ আহত হন অর্ধশত।

এই অভিযানের পরপরই দেশবাসীর দৃষ্টি মৌলভীবাজারে দুটি জঙ্গি আস্তানায়।  নাসিরপুরের আস্তানাটিতে পুলিশের অভিযান বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর শুরু হয়। ১৪৪ ধারা জারি থাকায় কাউকে ওই বাড়ির আশপাশে ঘেষতে দেয়া  হয়নি।  পওে মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে সাত থেকে আট জন নিহত হয়েছে। নিহতদের দেহ বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় পুলিশ সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেনি। নিহতদের মধ্যে পুরুষ, নারী এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কও আছে।  জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের এই আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শহরের আস্তানাটিতে অভিযান চালায়। ওই বাড়িতেও জঙ্গি রয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুটি বাড়িই এক লন্ডন প্রবাসীর।

এদিকে মৌলভীবাজারে অভিযানের মধ্যেই কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে একটি বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ। বুধবার বিকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়িসংলগ্ন গন্ধমতি এলাকার একটি তিন তলা বাড়ি ঘিরে রাখা হয়।কোটবাড়িসংলগ্ন গন্ধমতি এলাকার কবরস্থানের পাশে গাড়িচালক দেলোয়ার হোসনের মালিকানাধীন একটি তিনতলা ভবনে জঙ্গি রয়েছে খবরে র‌্যাব-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বাড়িটি ঘিরে রেখে অভিযান চালায়। এবং সবগুলো ঘটনার বর্ণনা প্রায়ই একই।

এদিকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে ছাত্রলীগ নেতাই বা সেথানে কি করছিল, বোমাটিই বা কিভাবে আসল, এ প্রশ্নে অভিযান পরিচালনাকারী সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী যখন বাড়িটিতে লক্ষ্য কওে গ্রেনেড ছুড়ছিল সে গ্রেনেড জঙ্গিরা ক্যাচ ধরে আবার অভিযানকারী আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেও দিকেই ছুড়ে মারছিল। এ ঘটনা সিনেমার নায়কেরা কওে থাকে সেটি দেখা যায় বাস্তবে যে ঘটে সেটি তাহলে এবার বাংলাদেশে ঘটেছে।

বাংলাদেশে জঙ্গি নিয়ে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার করার দাবী যতো জোরালো হচ্ছে, জঙ্গি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ততোই বাড়ছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে এ পর্যন্ত। হলি আর্টিজানে অভিযান চালিয়ে খুব দ্রুত সাফল্য পায় সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল। এমনকি শীর্ষ জঙ্গি নেতা গুলশান হামলার মাস্টারমাাইন্ড তামিম চৌধুরীকেও স্বল্প সময়ের অভিযানে ধরাশায়ী করছিল পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াট সদস্যরা। এর এক সপ্তাহের মাথায় ৭ই জুলাই ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম ও আনছারুল ইসলাম নামে দুই পুলিশ সদস্য, এক হামলাকারী ও এক নারী নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল একটি চাপাতি উদ্ধার এবং আহত অবস্থায় দুই সন্ত্রাসীসহ তিনজনকে আটক করা হয়।

গত বছর ২৬শে জুলাই ভোররাতে জঙ্গিদের কল্যাণপুরের আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় গোলাগুলিতে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। ২৭শে আগস্ট সকালে সোয়াট, সিটি ইউনিট, র‌্যাব ও পুলিশ  যৌথভাবে ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ চালায় নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার বড় কবরস্থান এলাকার একটি তিনতলা আবাসিক ভবন ‘দেওয়ান বাড়িতে।’ এ অভিযানে গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরীসহ তিনজন নিহত হয়। ৫ই সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরের ৩৩ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়িতে আরেকটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ অভিযানে গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার সামরিক প্রশিক্ষক মেজর জাহিদ নিহত হয়। রাজধানীর আজিমপুরে ১০ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আরো একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। বিজিবি সদর দপ্তরের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন ২০৯/৫ নম্বরের ছয়তলা ওই বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় ভেতরে থাকা নারী জঙ্গিরা পুলিশকে ছুরিকাঘাত ও মরিচের গুঁড়া ছুড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে আত্মহত্যা করে পুরুষ জঙ্গি তেহজীব করিম ওরফে আবদুল করিম। পুলিশ ওই সময় জানিয়েছিল গ্রেপ্তারকৃত নারী জঙ্গিরা জেএমবি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী এবং জঙ্গিনেতা রাহুলের স্ত্রী। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা তিন শিশুকে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক অভিযানে ৮ই অক্টোবর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) হাড়িনাল পশ্চিমপাড়া লেবুবাগান ও নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় পৃথক দু’টি জঙ্গি আস্তনায় র‌্যাব, পুলিশ, সিটি ইউনিট ও সোয়াটের অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। এর মধ্যে হাড়িনাল পশ্চিমপাড়া লেবুবাগানের অভিযানে ২ জন এবং হাড়িনাল পাতারটেক এলাকায় অভিযানে ৭ জঙ্গি নিহত হয়। একইদিনে টাঙ্গাইলে র‌্যাবের সঙ্গে পৃথক অভিযানে ২ জঙ্গি নিহত হয়। রাজধানীর পূর্ব-আশকোনার ‘সূর্য ভিলা’ নামে একটি বাড়ির আস্তানায় অপারেশন রিপল-২৪ নামে পুলিশের সোয়াট টিম ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের যৌথভাবে চালানো অভিযানে সন্তানসহ দুই নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেন। আত্মঘাতী ভেস্ট বিস্ফোরণে নিহত হয় আরেক নারী জঙ্গি। এ সময় এক শিশু গুরুতর আহত হয়। এছাড়া গোলাগুলিতে নিহত হয় এক কিশোর জঙ্গি। ১৫ই মার্চ বিকাল ৩টা থেকে ১৬ই মার্চ সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের সীতাকু-  উপজেলার কলেজ রোডে ছায়ানীড় নামে একটি বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলাকালে ‘আত্মঘাতী বিস্ফোরণে’ দুইজন এবং জঙ্গি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে গুলিবিনিময়ের সময় দু’জন নিহত হয়। তবে এতগুলো ঘটনার প্রায় প্রতিটিতেই অপারেশন সম্পর্কে আইনশৃংলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ছিল অস্পষ্ট ও গোাঁজামিলে ভরা। ফলে এসব অভিযানে আদৌ কি ঘটেছে তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছেই। সেই সাথে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রমান করছে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা যে থেমে নেই বরং তা বাড়ছেই।

‘ধাক্কায় বিস্ফোরিত বোমায় নিহত হন ছয়জন’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল হামলা নয়, আগে থেকে পড়ে থাকা বোমা ধাক্কা লেগে বিস্ফোরিত হলেই সিলেটের শিববাড়িতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হন। র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধানসহ আহত হন অর্ধশত।

বিবিসি বাংলা-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এমন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে যখন শিববাড়ির ওই সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানাটি নিরাপত্তা বাহিনী ঘেরাও করে ফেলে, তখনই বোধহয় কোনো একসময় এখানে আশেপাশে তারা বোমাটি রেখে গিয়েছিল বা আগেই রেখে গিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশরা যখন দেখেছে, তখনই এটা বিস্ফোরিত হয়েছে, ধাক্কা-ধোক্কা খেয়ে।’

‘জঙ্গিবাদ জিইয়ে রেখে উদ্দেশ্য হাসিল করছে সরকার: মীর্জা ফখরুল

সরকার জঙ্গিবাদকে জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রত্যেকদিন যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তাতে আমরা প্রচ- উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছি, উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সাপ্তাহে ৩/৪টি ঘটনা ঘটল আত্মঘাতী বোমা হামলার। সরকারের একেক প্রতিষ্ঠান-এজেন্সি একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছে।’

‘আসলে সরকার জঙ্গিবাদ সমাধান করতে চায় না। তারা এটাকে জিইয়ে রেখে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। কোনোমতে জঙ্গিবাদ যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয়, সেই আহ্বান আমরা জানাচ্ছি’ যোগ করেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here