দুই দ্বিগুণে পাঁচ! 

0
329

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষক সম্প্রতি তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘সরকার নিজেই কি অস্থিতিশীলতা ডেকে আনছে?’ সরকারের বর্তমান মেয়াদের সময় দুই বছরও নেই। আগামী নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। আর ঠিক এ সময়েই সড়ক দুর্ঘটনায় আদালতের রায় নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই নিয়ে, সরকারি মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন ডাক্তারদের কা-কারখানা নিয়ে এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে যা ঘটে গেল বা ঘটে চলেছে সেসব বিবেচনায় আনলে মনে করা যেতেই পারে, সরকারের ভেতরের একটি শক্তি ইচ্ছে করে অথবা ভুল করে অস্থিতিশীলতা ডেকে আনছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পর্যায়ক্রমে আলোচনায় আনলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১. একজন বাস ড্রাইভার বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মিশুক মুনীর এবং তারেক মাসুদকে হত্যা করায় আদালত সংশ্লিষ্ট ড্রাইভারকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করেন। অতঃপর তার প্রতিবাদে সারা দেশে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সেটাকে পরিবহন শ্রমিকদের স্বেচ্ছা কর্মবিরতি বলে চালিয়ে দেন। উল্লেখ্য, শাহজাহান খান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী নন। তিনি নৌপরিবহনমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী না হয়েও তিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের বিষয়ে যে বিবৃতি দিলেন, তা নিতান্তই গোঁজামিল। আর মাজেজা এখানেই। কারণ বিষয়টি অনেকটা স্থল পুলিশ এবং জল পুলিশের মতো হলেও শাজাহান খানের স্থল পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হল, তিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। যা হোক, তারপর যা ঘটল সে কথায় ফিরে আসি। শাজাহান খানের স্বেচ্ছা কর্মবিরতি ঘোষণার পর আরও একজন ট্রাক ড্রাইভার ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে সাভারে একজন নারীকে হত্যা করায় আদালত সেই ড্রাইভারের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন। আর সে রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শাজাহান খানের স্বেচ্ছা কর্মবিরতিতে যাওয়া শ্রেণীটি তা-বলীলা শুরু করে দিল। পুলিশকে আক্রমণ করা, পুলিশের গাড়ি, পুলিশ বক্স পুড়িয়ে দেয়া, এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা বাদ গেল। সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা এভাবে ত্রাসের সৃষ্টি করে সারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলল, বাসস্ট্যান্ডগুলোতে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ আটকা পড়ে নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হলেন। আর এভাবে সরকারের ভাবমূর্তি যেটুকু নষ্ট হওয়ার তা হয়ে গেল। চারদিক থেকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠল। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে সহিংস প্রতিবাদ, জ্বালাও-পোড়াও, আন্দোলন দেখে দেশের মানুষ প্রমাদ গুনলেন। সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা যে কতটা শক্তিশালী এবং তাদের গডফাদাররা যে কতটা ভয়ংকর, সে কথাও তারা প্রমাণ করলেন এবং সেই সঙ্গে তারা যে সড়ক পথে গাড়ি চালিয়ে নরহত্যার ওপেন লাইসেন্স চান সে কথাও সরকারকে বুঝিয়ে দিলেন। আর দেশের মানুষও সরকারের ভেতর এসব পরিবহন শ্রমিক নামধারী খুনিদের গডফাদারের অবস্থানের কথা বুঝে গেলেন!

২. সম্প্রতি আদালতকে আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আর তা হল স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তর্জন-গর্জনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু করে দিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কোনো জেলায় জেলা কমান্ডার, কোনো জেলায় উপজেলা কমান্ডার, কোনো জেলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, কোনো উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইত্যাদি পদের ব্যক্তিরা, যারা এতদিন অর্থাৎ গত ৪৬ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাদের চলমান যাচাই-বাছাইয়ে তালিকা থেকে বাদ দেয়ায় জেলা ও উপজেলা মিলিয়ে শত শত স্থানে এ নিয়ে মারামারি, বিবাদ, বিসংবাদ, সংঘর্ষ, মিছিল, ভাংচুরসহ নানা ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম ঘটায় সেসব স্থানে আইনশৃংখলার অবনতি ঘটেছে এবং বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার মিটিংয়ে সিনিয়র মন্ত্রীরা উপস্থাপন করেছেন। তাছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ঘটনাটিকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি বিনষ্টের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অবশেষে আদালত চলমান যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে স্থগিত ঘোষণা করায় আপাতত ক্ষেত্রটি শান্ত রয়েছে। যদিও শোনা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আপিল করে আবারও এ বিষয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাবে। বলাবাহুল্য, ইতিমধ্যেই এ কাজে যে ফল হয়েছে তা হল, ৪৬ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিজেদের মধ্যে দলাদলি, বিবাদ-বিসংবাদ, হিংসা, বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছেন। নইলে মাত্র একটি উপজেলাতেই তিন-চারশ’ মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে কেমন করে? কেমন করেই বা একটি উপজেলাতেই প্রায় তিনশ’ মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়েন? নির্বাচন সামনে রেখে আদালতের সঙ্গে লড়াই করে আবারও এ কাজে হাত দেয়ার ফলাফল সরকারি দলের জন্য ভালো হবে কিনা সে বিষয়টিও দলীয় হাইকমান্ড ভেবে দেখতে পারে। কারণ এসব কাজে সরকারি দলের মধ্যে ইতিমধ্যেই হানাহানি, দলাদলি এবং বিভেদ শুরু হয়েছে।

৩. দেশের ৮-৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজে বেশ কয়েকদিন ধরে ইন্টার্ন ডাক্তাররা ধর্মঘট পালন করায় সেসব কলেজের হাসপাতালগুলোতে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। এ দুর্ভোগ চলাকালে একটি হাসপাতালের রোগীকে বলতে শোনা গেল, এভাবে সরকারি হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মরার চেয়ে বাড়িতে গিয়ে মরাই ভালো! একজন সাধারণ মানুষ কর্তৃক এভাবে সরকারি হাসপাতালকে দোষারোপ করা আর সরকারকে দোষারোপ করা একই কথা। চারজন ইন্টার্ন ডাক্তার রোগী এবং তার পরিবারদের মারধর করায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওই ডাক্তারদের কিছুটা শাস্তি দেয়ায় অন্যান্য হাসপাতালের ডাক্তাররাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ধর্মঘটে যায়। তাহলে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য থাকল কোথায়? যে চারজন ডাক্তার অপকর্ম করেছিল, তার সঙ্গে আরও ৭-৮টি হাসপাতালের ডাক্তারদের যোগদানের রহস্য বা যোগসূত্র এসব ডাক্তারের একই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়তো? রাজনৈতিক পরিচয় বলতে এখানে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের কথা বলা হচ্ছে। যদি এসব ডাক্তার অতীতে ছাত্রলীগ বা বর্তমানে সরকারি দলের ডাক্তার সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন এবং সে কারণে যদি অন্যান্য হাসপাতালে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তো এই আন্দোলন ট্রাক-বাস ড্রাইভারদের আন্দোলনের চেয়ে কম ভয়ংকর নয়। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে চারজন ডাক্তারের শাস্তি প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি সামাল দিল তাতে করে মনে হয় এসব ডাক্তার সরকারি দলের সংগঠনের লোক অথবা তাদেরই ছত্রচ্ছায়ায় লালিত। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, যদি চারজন ডাক্তারের শাস্তি মওকুফ করাই হবে, তাহলে শুধু শুধু শত শত অসুস্থ মানুষকে বিপদে ফেলা হল কেন? জানি না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও মশকারা করে নৌপরিবহনমন্ত্রীর মতো বলবে কিনা ‘ডাক্তার সাহেবরা স্বেচ্ছায় বিশ্রামে গিয়েছিলেন।’ যদি তাই না হবে, তাহলে রোগী পেটানো ডাক্তারদের শাস্তি মওকুফ হয় কী করে? দেশের বর্তমান অবস্থায় যদি সরকারি আনুকূল্য না থাকে তাহলে এমন আচরণ করে ডাক্তাররা পার পেয়ে যান কী করে? পরিবহন শ্রমিকরা জিম্মি করেছিল যাত্রীদের আর ডাক্তাররা জিম্মি করেছিল অসহায় দরিদ্র রোগীদের। এসব দেখে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহেবের মন্তব্যই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। সরকার নিজেই তো বেসামাল কাজকর্ম করছে। একবার ডাক্তারদের শাস্তি দিয়ে রোগীদের দুর্ভোগে ফেলছে, আবার তাদের শাস্তি মওকুফ করে দিচ্ছে। এসব কীসের লক্ষণ? ছোট করে আরও একটু বলি, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে যে কয়টা টাকা পাবেন, তার চেয়ে কতগুণ চুরি-চামারিতে চলে যাচ্ছে তা ভেবে দেখেছেন কি?

পরিশেষে বলব, মাত্র যে কয়টি ঘটনার উদাহরণ দেখিয়ে যা বলা হল, সে বিষয়গুলো মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, অথচ তার অধীনস্থ দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেউ কেউ দায়িত্বহীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি করতে গিয়ে দেশের মানুষের সামনে ভুল বার্তা প্রেরণ করছেন। দেশের মানুষ এখন অনেক কিছু বোঝে। দুই দ্বিগুণে পাঁচ এ ধরনের বুঝ দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : রাজনীতিক, কলামিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here